নবি করিম (সা) এবং ৯ জন সাহাবি | ওহুদের যুদ্ধ-৪ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

নবি করিম (সা) এবং ৯ জন সাহাবি | ওহুদের যুদ্ধ-৪, ওহুদ যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়ে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ যখন পাল্টা আক্রমণ করে, তখন আবু বকর (রা), উমর (রা) ও অন্য সাহাবিরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে- ছিটিয়ে ছিলেন। কারণ, তাঁরা ধারণা করেছিলেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, মুসলিমদের বিজয় হয়েছে। সেই সময় নবি করিমের (সা) সঙ্গে ছিলেন মাত্র ৯ জন সাহাবি। তাঁদের মধ্যে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ ছিলেন মুহাজির; বাকি সবাই ছিলেন আনসার, তাঁদের নাম আমাদের জানা নেই ।

নবি করিম (সা) এবং ৯ জন সাহাবি | ওহুদের যুদ্ধ-৪ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

নবি করিম (সা) এবং ৯ জন সাহাবি | ওহুদের যুদ্ধ-৪ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

ওই সাহাবিরা সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন যে এখন তাঁদের পালানো প্রয়োজন, কারণ ৯ জনের একটি ক্ষুদ্র দলের পক্ষে ১৫০ জনের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রতিরোধ করা অসম্ভব। তাঁরা দূর থেকে খালিদের দলকে দেখতে পেয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে, খালিদ ও তার দলের লোকদের পৌঁছানোর আগেই তাঁরা পাহাড়ের দিকে সরে গিয়ে আশ্রয় নেবেন। আনসাররা ওহুদ পর্বতের নাড়িনক্ষত্র চিনতেন, কোথায় লুকাতে হবে তা তাঁদের জানা ছিল।

অন্যদিকে কুরাইশদের সামনে ছিল এক বিশাল পর্বত, মুসলিমরা সেই পর্বতের কোথায় লুকাতে পারেন তা ধারণা করা কুরাইশদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। নবি করিম (সা) যেখানে অবস্থান করছিলেন, সেখান থেকে সরে গিয়ে পর্বতের ছোট ও সরু একটি গর্ত বা খোঁড়লের মধ্যে আশ্রয় নেন। সেই স্থানটি ছিল এমনই অপরিসর যে একজন বা সর্বোচ্চ দুইজনের পক্ষে একসঙ্গে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল, তার বেশি নয় ।

নবিজি (সা) ও সাহাবিরা যখন পর্বতের পেছনে লুকালেন, ততক্ষণে কুরাইশদের দল কাছাকাছি চলে এসেছে। এই অবস্থায় নবিজি (সা) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, “এদের মোকাবেলা করার দায়িত্ব কে নেবে? যে নেবে সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে।” সাহাবি তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ সবার আগে  বললেন তিনি এই দায়িত্ব নিতে চান। কিন্তু নবিজি (সা) তাঁকে তাঁর সঙ্গেই। থাকতে বললেন। তারপর এক আনসার এই দায়িত্ব নিতে চাইলে তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন তিনি তালহাকে নিজের সঙ্গে রাখলেন। কারণ, তালহা ছিলেন ওই নয় সাহাবির মধ্যে সেরা যোদ্ধা, নবিজি (সা) তাঁকে পর্যন্ত পাশে রাখতে চেয়েছিলেন। ওদিকে ওই আনসারটি কুরাইশদের মোকাবেলা করতে গিয়ে শহিদ হন।

 

সেই সময়ের টুকরো টুকরো ঘটনাগুলো জোড়া দিলে সেখানে কী ঘটেছিল তা আমরা মোটাদাগে ধারণা করতে পারি। নবিজির (সা) সঙ্গে থাকা সাহাবিরা এক এক করে ছিন্ন-ভিন্ন দিকে এমনভাবে চলে যেতে থাকেন, যাতে তাঁদের গতিবিধি লক্ষ করে কেউ অনুসরণ করতে না পারে। সম্ভবত তাঁরা এই কৌশলটি নেন কুরাইশদের বিভ্রান্ত করার জন্য যাতে তারা নবিজির (সা) কাছ পর্যন্ত পৌঁছতে না পারে। এভাবে তাঁরা কুরাইশদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হলেও ৭ জন আনসারের সবাই একে একে শাহাদাত বরণ করেন। শেষ পর্যন্ত নবিজির (সা) সঙ্গে রয়ে যান শুধু দুজন মুহাজির সাহাবি: তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ।

নবিজির (সা) জীবনে সম্ভবত এটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপর্যয়কর মুহূর্ত। এর আগে তিনি তায়েফেও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তায়েফের লোকেরা অত্যন্ত নীচু মানসিকতার হলেও তারা তাঁকে শুধু লাঞ্ছিত করতে চেয়েছিল, হত্যা করার ইচ্ছা তাদের ছিল না। আর ওহুদের ময়দানে চলছে প্রকাশ্য যুদ্ধ, যেখানে তাঁর সঙ্গে আছেন মাত্র দুজন সাহাবি। এটা বিবেচনা করলে, নবিজির (সা) জীবনে এর চেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি আর কখনও আসেনি ।

 

নবি করিম (সা) এবং ৯ জন সাহাবি | ওহুদের যুদ্ধ-৪ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

উল্লেখ্য, তালহা ও সাদ উভয়ে ছিলেন অভিজ্ঞ তিরন্দাজ। তা ছাড়া তালহা ছিলেন দুর্দান্ত একজন যোদ্ধা। ধারণা করা যায়, খালিদের বাহিনী আসার আগেই নবিজি (সা) তালহা ও সাদকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের ওই খোঁড়লের ভেতরে ঢুকে পড়েন। সেখান থেকে যাদেরই দেখা যাচ্ছিল, তালহা ও সাদ তাদের দিকেই ক্রমাগত তির নিক্ষেপ করেন; কোথাও ধুলা উড়তে দেখলেও তাঁরা সেদিক লক্ষ করে তির নিক্ষেপ করতে থাকেন।

আরেকটি বর্ণনায় আছে, শত্রুপক্ষের কেউ আসছে কি না তা দেখার জন্য নবিজি (সা) একবার পাহাড়ের ওই খোঁড়ল থেকে বেরিয়ে উঁকি মারার চেষ্টা করেন। তা দেখে তালহা বলেন, “হে আল্লাহর রসুল, (আপনি বন্দি হলে) আমার মা-বাবাকে যেন আপনার জন্য মুক্তিপণ হিসেবে দেওয়া হয়। দয়া করে আপনি বাইরে তাকাবেন না। কোনো না কোনো দিক থেকে তির এসে আপনার গায়ে লাগতে পারে। হে আল্লাহর রসুল, আপনার বুকের পরিবর্তে আমার বুক পেতে রাখা আছে। আমি আপনার সামনে পাহারায় আছি।”

Leave a Comment