তাওয়াক্কুলের আসল অর্থ ও প্রয়োগ | মদিনায় হিজরত থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা, হিজরতের প্রস্তুতির বিষয়টি লক্ষ করুন। নবিজি (সা) আবু বকরকে (রা) মদিনায়। যেতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি তাঁকে এও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তাঁর একজন সহযাত্রীর প্রয়োজন হবে, এবং আল্লাহ ইচ্ছা করলে তিনিই হবেন সেই ব্যক্তি। সুতরাং আবু বকর (রা) খুবই গুরুত্বের সঙ্গে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি দুটি উটকে যাত্রার জন্য বিশেষ খাবার দিয়ে মোটাতাজা করছিলেন।

তাওয়াক্কুলের আসল অর্থ ও প্রয়োগ | মদিনায় হিজরত থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন
নবিজি (সা) এমন সময়ে আবু বকরের (রা) বাড়িতে গিয়েছিলেন যখন লোকেরা মধ্যাহ্নের খাবারের পর ঘুমায়; ফলে কেউ তাঁকে দেখতে না পায়। এ ছাড়া তিনি বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে কাপড় দিয়ে নিজের মুখমণ্ডল ঢেকে রেখেছিলেন। এত প্রস্তুতি সত্ত্বেও তিনি আবু বকর (রা) ছাড়া সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন। আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখার ক্ষেত্রে নবিজির (সা) ওপরে তো কেউ নেই। তবু তিনি এত প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সাবধানতা অবলম্বন করছেন।
এ থেকে আমরা আমাদের ধর্মের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রকাশ দেখতে পাই। তা হলো, আমাদের যা কিছু করা সম্ভব, তার সবই করতে হবে। লক্ষ করুন, নবিজি (সা) কী কী করেছেন। তিনি আলিকে (রা) বিছানার পাশে রেখে এসেছেন, মধ্যরাতে রওনা হয়েছেন, আমির ইবনে ফুহায়ের মেঘের পালের মাধ্যমে যাত্রাপথের চিহ্নগুলো মুছে দিয়েছেন, একটি বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক আগে থেকে খুঁজে রেখেছেন, আসমা তাঁদের খাবার পাঠাতেন, আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর বাজারে গিয়ে লোকদের কথোপকথন থেকে খবর সংগ্রহ করতেন, ইত্যাদি। অন্যদিকে দেখুন, তিনি নিশ্চিন্ত ও শান্ত মনে যাত্রাপথে কোরান তেলাওয়াত করছেন। তিনি জানেন যে, তাঁর পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব তার সবই তিনি করেছেন। এত প্রস্তুতির পরেও তাঁর হৃদয় আল্লাহ আজ্জা ওয়াজালের প্রার্থনায় মগ্ন। এটিই তাওয়াক্কুলের মূল কথা।
আবার দেখুন, গুহার ভেতরে আবু বকর (রা) যখন উদ্বিগ্নভাবে বললেন, “তারা যদি শুধু নিচে তাকায় তাহলেই আমাদের দেখতে পাবে” তখন নবিজি (সা) তাঁকে শান্ত করলেন। প্রকৃতপক্ষে তাওয়াক্কুল মানে এই নয় যে, আপনি লোকসমক্ষে গিয়ে বলবেন, ‘হে কুরাইশ! আমরা এখানে আছি। তোমরা আমাদের কাছে আসতে পার। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন। তাওয়াক্কুল মানে আপনি গুহায় লুকিয়ে আছেন, আপনার সাধ্যমতো সব সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নিয়েছেন, এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করছেন। তখন আল্লাহ তায়ালা নিশ্চিত করবেন যে, কুরাইশরা নিচে তাকাবে না। এবং আল্লাহ তা করেছেন। সুতরাং আমরা আমাদের করণীয় কাজগুলো করলেই শুধু আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাজ করবেন।

মক্কা বিজয়ের (৮ম হিজরি) পরে মুসলিমরা যখন সাফল্যের চূড়ান্তে পৌঁছে, তখন আল্লাহ তায়ালা সাহাবিদের উদ্দেশে এই সুন্দর আয়াতটি নাজিল করেন:
“যদি তোমরা তাঁকে (রসুলকে) সাহায্য না করো, তবে (স্মরণ করো) আল্লাহই তাঁকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন দুইজনের একজন। যখন তাঁরা গুহার মধ্যে ছিলেন, তিনি (রাসুল) তখন তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন, “মন খারাপ করো না, আল্লাহ তো আমাদের সাথেই আছেন।’ তারপর আল্লাহ তাঁর ওপর প্রশাস্তি বর্ষণ করেন। তাঁকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা যা তোমরা দেখতে পাওনি। এবং তিনি কাফেরদের কথা হেয় করেন। আল্লাহর কথাই সবার ওপরে। আর আল্লাহ তো পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” [সুরা তওবা, ৯:৪০] অনেক তাফসিরকারীর মতে, সৈন্যবাহিনী বলতে এখানে কবুতর, মাকড়সা ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে।
