ইসলামে সাম্য ও সমতা

ইসলামের মূল্যবোধের মূল ভিত্তিগুলোর একটি হলো সমতা বা ন্যায্যতা। তবে ইসলামে যে সমতার কথা বলা হয়েছে, তাকে কখনোই একরূপতা বা সবাইকে হুবহু একই রকম ভাবার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ইসলাম শিক্ষা দেয়—আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান মর্যাদাসম্পন্ন, কিন্তু সবাই একরকম নয়। মানুষের সক্ষমতা, যোগ্যতা, সম্ভাবনা, আকাঙ্ক্ষা, সম্পদ ও প্রতিভার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য রয়েছে।

এই পার্থক্যগুলোর অনেকটাই প্রাকৃতিক। আবার কিছু সামাজিক সীমাবদ্ধতা সমাজের অভিজ্ঞতা ও চর্চা থেকে তৈরি হয়, যা মূলত মানুষের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন—অজ্ঞ ও জ্ঞানীর মধ্যে পার্থক্য সুপ্রতিষ্ঠিত। কোনো সমাজেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এমন কাউকে দেওয়া হয় না, যে অজ্ঞ বা অযোগ্য।

তবে এসব পার্থক্যের কোনোটি একা কোনো মানুষ বা জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে না। মানুষের বংশ, গায়ের রং, সম্পদের পরিমাণ বা সামাজিক মর্যাদা—আল্লাহর কাছে এগুলোর কোনো গুরুত্ব নেই। আল্লাহর কাছে একমাত্র যে পার্থক্যটি গ্রহণযোগ্য, তা হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। আল্লাহ যে মানদণ্ড প্রয়োগ করেন, তা হলো নৈতিকতা ও আত্মিক উৎকর্ষ।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

“হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্র, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব বিষয়ে অবগত।”
(সূরা আল-হুজুরাত : ১৩)

এর মাধ্যমে ইসলাম স্পষ্ট করে দেয়—কোনো জাতি বা গোষ্ঠীকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার সৎকর্ম ও আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে—মানুষের চোখে হোক বা আল্লাহর দৃষ্টিতে।

বর্ণ, জাতি বা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য কেবল বাহ্যিক ও আকস্মিক। এগুলো আল্লাহর কাছে মানুষের প্রকৃত মর্যাদাকে প্রভাবিত করে না। ইসলামের সমতার ধারণা কেবল সংবিধানিক অধিকার বা দয়ার দান নয়; এটি একটি ঈমানি বিষয়, যা একজন মুসলমানকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ ও অনুসরণ করতে হয়।

ইসলামে সমতার এই মূল্যবোধ গভীরভাবে প্রোথিত এবং তা কয়েকটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত—

  1. সব মানুষ একই চিরস্থায়ী ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সৃষ্টি।

  2. সমগ্র মানবজাতি আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর বংশধর এবং একই মানবপরিবারের সদস্য।

  3. আল্লাহ তাঁর সব সৃষ্টির প্রতি ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু; তিনি কোনো জাতি, বয়স বা ধর্মের প্রতি পক্ষপাত করেন না।

  4. মানুষ জন্মায় শূন্য হাতে এবং মৃত্যুবরণ করে শূন্য হাতেই—এই অর্থে সবাই সমান।

  5. আল্লাহ প্রত্যেককে তার নিজ নিজ কর্ম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচার করবেন।

  6. আল্লাহ মানুষকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

এই নীতিগুলোই ইসলামে সমতার ভিত্তি। এ ধারণা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সমাজে বৈষম্য, বিদ্বেষ বা নির্যাতনের কোনো স্থান থাকে না। যখন এই ঐশী বিধান কার্যকর হয়, তখন নিপীড়ন ও শোষণের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন “বিশেষ জাতি”, “অধম জাতি”, “উচ্চ বর্ণ”, “নিম্ন বর্ণ” বা “বিশেষ নাগরিক”—এ ধরনের ধারণাগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“হে মানুষ! তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতা একজন। তোমরা সবাই আদম থেকে এসেছ, আর আদম সৃষ্টি হয়েছেন মাটি থেকে। আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। কোনো আরব অনারবের ওপর শ্রেষ্ঠ নয়, কোনো কৃষ্ণাঙ্গ শ্বেতাঙ্গের ওপর নয়, কোনো শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গের ওপর নয়—তাকওয়া ছাড়া।”
(মুসনাদ আহমদ, তিরমিজি)

আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো—“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?” তিনি উত্তর দিলেন—

“যে মানুষ মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।”
(তাবারানি)

অতএব, মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণ একরূপ সমতা দাবি করা বাস্তবসম্মত নয়। যদিও অধিকার, দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে মানুষ মূলত সমান, তবু স্বভাব, মেধা ও যোগ্যতার দিক থেকে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক বৈচিত্র্য রয়েছে। এই বৈচিত্র্যের কারণে সমাজে কিছু প্রাকৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকবে—কিছু সাময়িক, কিছু স্থায়ী।

তবে কোনো একটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকার অর্থ এই নয় যে, অন্য সব ক্ষেত্রেও সে ব্যক্তি কম মর্যাদার। নৈতিকভাবে সৎ মানুষ ও অসৎ মানুষ সমান নয়, যদিও অন্য দিক থেকে তারা সমান হতে পারে। তেমনি বুদ্ধিমান ও অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি এক নয়, কিন্তু মানবিক মর্যাদায় তারা সমান। একইভাবে নারী ও পুরুষের বৈশিষ্ট্য, প্রতিভা ও সক্ষমতা একরকম নয়—তবে আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি একটাই: তাকওয়া ও সৎকর্ম

Leave a Comment