সাদ ইবনে মুআদের মৃত্যু | খন্দকের (আহজাবের) যুদ্ধ-৩, খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে সবচেয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুটি ছিল সাদ ইবনে মুআদের (রা)। আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন, সাদ যখন যুদ্ধের প্রাক্কালে আল- ফারি দুর্গে বর্ম পরে তার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে যান, তখন তিনি (আয়েশা) সেখানেই ছিলেন। এই বিদায়ের অর্থ হলো, সাদ এখন যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারিতে চলে যাচ্ছেন, এবং যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে তাঁর দেখা হবে না। আয়েশা (রা) যে সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন, তখনও হিজাব-সংক্রান্ত আয়াতগুলো নাজিল হয়নি।
সাদ ইবনে মুআদের মৃত্যু | খন্দকের (আহজাবের) যুদ্ধ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সাদের মা বললেন, “ওহে আমার পুত্র, তাড়াতাড়ি করো! আমার সঙ্গে থেকে আর সময় নষ্ট করো না। তাড়াতাড়ি যুদ্ধক্ষেত্রের সামনে চলে যাও।” সাদ চলে গেলে আয়েশা (রা) তাঁর মাকে বললেন, “তাঁর বর্মটি আমার কাছে বেশ হালকা বলে মনে হয়েছে। আরেকটু ভারি বর্ম পরলে ভালো হতো।” আয়েশা (রা) আরও বর্ণনা করেছেন, সাদ বুকে শুধু একটি ‘ব্রেস্টপ্লেট’ পরে ছিলেন; অর্থাৎ তাঁর বুকটি ঢাকা থাকলেও বাহু ও হাতসহ দেহের বাকি অংশ ছিল উন্মুক্ত।
যুদ্ধের ময়দানে হিবান ইবনে আল-আরিকা নামের এক ব্যক্তির ছুঁড়ে দেওয়া একটি তির এসে তাঁর ডান হাতের উপরের অংশের উন্মুক্ত অংশে, একদম ঘাড়ের পাশে গভীরভাবে বিধে যায় (আয়েশা এরকম কিছু নিয়েই শঙ্কিত ছিলেন)। সেই ক্ষত আর সারেনি। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই সাদ ইবনে মুআদ (রা) শাহাদাত বরণ করেন।
সাদ ইবনে মুআদ (রা) ছিলেন মদিনায় প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। তিনি ধর্মান্তরিত হওয়ার ফলেই তাঁর পুরো গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তিনি তাঁর গোত্রের লোকদের বলেছিলেন, “যতক্ষণ না তোমরা মূর্তিপূজা ত্যাগ করো এবং এক আল্লাহকে গ্রহণ করো, ততক্ষণ আমি তোমাদের কারও সঙ্গে কথা বলব না।” তাঁর গোত্রের লোকেরা তাঁর প্রতি ভালবাসার কারণেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
সাদই সেই সাহাবি, যিনি বদরের যুদ্ধের আগে এই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন যা নবিজিকে (সা) উজ্জীবিত করেছিল: “হে আল্লাহর রসুল, আপনি যা উপযুক্ত মনে করেন, তা-ই করুন। আমরা আপনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি, আপনার ওপর আস্থা রেখেছি এবং সাক্ষ্য দিয়েছি যে আপনি যা নিয়ে এসেছেন তা পুরোপুরি সভা। যিনি আপনাকে সত্য বার্তা দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তারই শপথ করে বলছি, আপনি যদি আমাদেরকে দৌড়ে গিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেন, আমরা তবুও আপনার পেছনেই থাকব। আমরা আগামীকাল শত্রুর মোকাবেলা করতে মোটেই ভয় পাচ্ছি না। আমরা অবশ্যই যুদ্ধের সময় আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা দেব। আল্লাহ আপনাকে আমাদের মাধ্যমে তা-ই দেবেন যা আপনাকে সন্তুষ্ট করবে। অতএব আল্লাহর নেয়ামতের পথে এগিয়ে যান। আমরা আপনার ঠিক পেছনেই আছি।”
আমরা ৩৭তম পর্বে সাদের এই বক্তব্যের পটভূমি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি।
সাদই সেই ব্যক্তি, যাঁর মৃত্যুর পর স্বয়ং ফেরেশতারা তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করেছিলেন এবং তাঁর দেহ ওপরে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। নবি করিম (সা) নিজে এ কথা বলেছেন। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, সাদের মৃত্যুতে আল্লাহর সিংহাসন কেঁপে উঠেছিল।
এর দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে:
(১) আরশটি কেঁপেছিল তাঁকে অভিবাদন জানানোর জন্য; অথবা (২) তাঁকে হত্যা করার ফলে সৃষ্ট ক্ষোভের কারণে তা কেঁপে উঠেছিল।
উভয় ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য। সাদ ইবনে মুআদ (রা) আহত থাকা অবস্থায় আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ, আপনি যদি কুরাইশদের আবার যুদ্ধের ময়দানে ফিরে আসতে দেন, তবে আমাকেও বেঁচে থেকে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সুযোগ দিন। কারণ তারা আপনার রসুলের (সা) সঙ্গে যা করেছে তাতে আমার চোখে তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কোনো জাতি নেই। কিন্তু এটাই যদি তাদের বিরুদ্ধে আমাদের শেষ যুদ্ধ হয়, তাহলে আমাকে শহিদ হিসেবে গ্রহণ করুন। কিন্তু বনু কুরায়জার কী পরিণতি হয় তা দেখে আমার নয়ন জুড়ানোর সুযোগ করে দিন।” আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেছিলেন। বনু কুরায়জাকে শাস্তি দেবার দায়িত্ব সাদের ওপরই বর্তেছিল।

যুদ্ধ শেষ হয়, সাদের ক্ষতের অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। এমনকি তিনি হাঁটার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। তাই তাঁকে বনু কুরায়জার কাছে ধরাধরি করে বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল। তিনি ‘যে রায় দিয়েছিলেন তাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।’ রায় দেওয়া কিছু পরেই সাদ ইবনে মুআদের (রা) মৃত্যু হয়। আমরা এই ঘটনা নিয়ে ৬১ তম পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করব।
সাদ নবিজির (সা) মনের কতটা অংশ জুড়ে ছিলেন তা তাঁর মৃত্যুর দুবছর পরের একটি ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি। সপ্তম-অষ্টম হিজরিতে নবিজি (সা) যখন আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসকদের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছিলেন, তখন একটি প্রদেশ (বর্তমানে বাহরাইন) থেকে চিঠির উত্তর আসে। সেখানকার সম্রাট চিঠির উত্তরের সঙ্গে নবিজির (সা) জন্য উপহার হিসেবে একটি স্বর্ণখচিত আলখেল্লা (গাউন) পাঠিয়েছিলেন।
নবিজি (সা) এমন সুন্দর আলখেল্লা আগে কখনও পরেননি। তিরমিজিতে বলা হয়েছে, আলখেল্লাটি এত সুন্দর ছিল যে, সাহাবিরা নবিজির (সা) কাছে গিয়ে তা হাত দিয়ে ধরে দেখেছিলেন। সাহাবিদের উৎসাহ দেখে তিনি তাঁদের বলেন, “তোমরা কি এটা দেখে মুগ্ধ? আল্লাহর কসম, জান্নাতে সাদ ইবনে মুআদের রুমালও এর চেয়ে উত্তম।” সুবহানআল্লাহ! নবিজি (সা) তখনও সাদ ইবনে মুআদের কথা ভাবছেন। ভেবে দেখুন, তাঁর মনে সাদের জন্য কতটা ভালোবাসা জমে ছিল!
