মহানবি মুহাম্মদের (সা) কি নিজস্ব মতামত দেওয়ার অনুমতি ছিল? | বদরের যুদ্ধ-৫ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

মহানবি মুহাম্মদের (সা) কি নিজস্ব মতামত দেওয়ার অনুমতি ছিল? | বদরের যুদ্ধ-৫, মহানবি মুহাম্মদের (সা) কি ‘ইজতেহাদ’ (স্বাধীনভাবে বিচার-বিশ্লেষণ) করে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার অনুমতি ছিল? তিনি কি নিজের মতামত প্রয়োগ করতে পারতেন? না কি তিনি যা কিছু বলতেন তার সবই সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছ থেকে আসা? এই ইস্যুটি নিয়ে ফিকহ শাস্ত্রের (‘উসুল আল- ফিকহ) আলেমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই আলোচনা করে আসছেন। এ বিষয়ে কয়েকটি মত আছে;

 

মহানবি মুহাম্মদের (সা) কি নিজস্ব মতামত দেওয়ার অনুমতি ছিল? | বদরের যুদ্ধ-৫ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মহানবি মুহাম্মদের (সা) কি নিজস্ব মতামত দেওয়ার অনুমতি ছিল? | বদরের যুদ্ধ-৫ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

এখানে আমরা দুটি প্রধান মত নিয়ে আলোচনা করব:

১. প্রথম মতটি হলো, নবি করিম (সা) যা কিছু বলেছেন তা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে ওহির মাধ্যমে এসেছে। এটি অল্প সংখ্যক আলেমদের মত। তাঁরা এ বিষয়ে পবিত্র কোরানের দুটি আয়াতের উল্লেখ করেছেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন: “আর সে নিজের ইচ্ছামতো কোনো কথা বলে না। বরং তা হচ্ছে ওহি যা (তার কাছে) নাজিল হয়…” [সুরা নজম ৫৩:3-8]

২. দ্বিতীয় মত অনুসারে, স্পষ্টতই আল্লাহ নবি করিমকে (সা) ইজতেহাদ করার অধিকার দিয়েছেন। আল্লাহ কখনও কখনও নবিজির (সা) নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সংশোধন করতেন, আবার মাঝে মাঝে তা বাস্তবায়ন করতেও দিতেন। তবে উভয় ক্ষেত্রেই ইজতেহাদ থেকে উদ্ভূত সিদ্ধান্তগুলো অনুসরণ করা সাহাবিদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। মোদ্দাকথা হলো, নবিজি (সা) সাহাবিদের যা নির্দেশ দিতেন তা তাঁদের পালন করতে হতো। এই মতের আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: নির্দেশটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসুক কিংবা নবিজির (সা) পক্ষ থেকেই আসুক, তিনি আপনাকে যা করতে বলবেন তা আপনাকে অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। এটিই বেশিরভাগ সুন্নি আলেমের মত।

এটি ঠিক যে, উল্লেখিত প্রথম মতের পক্ষে আয়াতে [৫৩:৩-৪] ‘ওহি’ বলতে পবিত্র কোরানকেই বোঝানো হয়েছে। একটি হাদিস অনুসারে, নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুলে যাও, আমিও তেমনি ভুলে যাই।” আবার অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেছেন, “আমারও মাঝে মাঝে রাগ হয় ।” অর্থাৎ তাঁর মধ্যেও সাধারণ মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল । সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, তিনি মাঝে মাঝে কিছু বিষয়ে ইজতেহাদ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। সিদ্ধান্ত সঠিক না হলে আল্লাহ তায়ালা কখনও সংশোধন করে দিতেন, কখনও তিনি নিজেও সংশোধন করে নিতেন। এ বিষয়ে কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে:

ক. বদরের যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে নেওয়া সিদ্ধান্ত থেকে আমরা জানি যে, নবিজি (সা) নিজেই ইজতেহাদ করেছিলেন। এটি পুরোপুরি সেক্যুলার কোনো বিষয় ছিল না, এটিকে আধা-ধর্মীয় ও আধা-সেক্যুলার বিষয় বলা যেতে পারে । পরবর্তীকালে আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁর ওই সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে সঠিক ছিল না ।

 

খ. সহিহ বুখারিতে ক্রস পলিনেশনের (৭) উল্লেখ আছে, যেখানে নবিজি (সা) কয়েকজন কৃষককে চাষাবাদের ব্যাপারে নিজ থেকে ক্রস-পলিনেশন সংক্রান্ত কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা তারা অনুসরণও করেছিল। কিন্তু যা আশা করা হয়েছিল, ফল সেরকম হয়নি। পরে নবিজি (সা) তাঁদের বলেন, “আমি যখন দ্বীনের বিষয়ে তোমাদের কিছু বলি তখন আল্লাহর রসুলের ভূমিকায় থাকি। আর যখন জাগতিক বিষয়ে তোমাদের কোনো কিছু বলি, সে বিষয়ে তোমরাই তো আমার চেয়ে ভালো জানো।” সুতরাং এ ঘটনায় পরিষ্কার যে তিনি এটি তাঁর নিজের ইজতেহাদ থেকেই বলেছিলেন।

গ. কবরে যেতে নিষেধ করার বিষয়টিও একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। নবিজি (সা) নিজেই বলেছিলেন, “আমি একসময় তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করতাম। তবে এখন (আমি বলছি) তোমরা চাইলে কবর জিয়ারত করতে পার।” এই নিয়মটি পরিবর্তন করার বিষয়ে আল্লাহর কাছ থেকে কোনো ওহি এসেছিল বলে মনে হয় না। বরং তিনি নিজেই হয়তো অনুভব করেছিলেন যে, কবর জিয়ারত করা যেতে পারে।

ঘ. আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো, নবি করিম (সা) বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে ‘আল-পিলা’ নিষেধ করেছিলাম। তারপর আমি দেখলাম যে, রোমান ও পার্সিয়ানরা এটি করছে এবং তাতে তাদের শিশুদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। সুতরাং (আমি এখন বলছি যে) তোমরা এটি করতে পার।” আল-গিলা অর্থ সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া, যা প্রসবের পর থেকে আনুমানিক এক বছর পর্যন্ত।

ঙ. কম হিজরি সালে তাবুকের যুদ্ধের সময় নবিজি (সা) মুনাফেকদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে আল্লাহ এই পরিপ্রেক্ষিতে সুরা তওবায় নিচের আয়াতটি নাজিল করেন:

“(হে নবি) আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। (ইমানের দাবিতে) কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী, এ বিষয়টা তোমার কাছে স্পষ্ট হওয়ার আগেই কেন তুমি তাদের (যুদ্ধে যাওয়া থেকে) অব্যাহতি দিলে?” [৯:৪৩)

চ. ফাতেমা বিনতে কায়েস ছিলেন একজন সুন্দরী যুবতী। তাঁর স্বামী যুদ্ধে শহিদ হলে অনেকেই তাঁকে বিয়ে করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। স্বামী মারা যাওয়ায় তাঁর থাকার মতো আশ্রয়ও ছিল না। তাঁর এ অবস্থা দেখে নবিজি (সা) বললেন, “তুমি উম্মে শুরায়েকের বাড়িতে গিয়ে ইদ্দতকালীন সময় পার করো। তারপর আমি দেখব তুমি কাকে বিয়ে করবে।” তবে পরে তিনি তাঁর কাছে বার্তা পাঠিয়ে বলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, অনেক তরুণ সাহাবি উম্মে শুরায়েকের বাড়িতে যায়। তাই তুমি তাঁর ওখানে এখন থেকো না। কারণ তরুণ সাহাবিরা হয়তো তোমাকে এমন অবস্থায় দেখে ফেলতে পারে যেভাবে তাদের দেখা উচিত নয়। তুমি বরং তোমার কাজিন ভাই ইবনে উম্মে মাকতুমের বাড়িতে গিয়েই থাকো, যেহেতু সে একজন অন্ধ।”

 

মহানবি মুহাম্মদের (সা) কি নিজস্ব মতামত দেওয়ার অনুমতি ছিল? | বদরের যুদ্ধ-৫ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

ছ. হজের সময়ও নবিজি (সা) ‘কিরান হজ’ (৮) করেছিলেন। পরে তিনি বলেন, তিনি যদি আগে থেকে আরও ভালো করে জানতেন তাহলে তিনি ‘তামাতু হজ’ (৯) করতেন।

জ. তৃতীয় হিজরি সালে ওহুদের যুদ্ধে নবিজি (সা) গুরুতর আহত হওয়ার পর বলেছিলেন, “আল্লাহ তোমাদের (মুশরিকদের) কীভাবে ক্ষমা করবেন?” এ বিষয়ে আল্লাহ পবিত্র কোরানে কঠোর ভাষায় আয়াত নাজিল করেন : 

“তিনি তাদের ক্ষমা করবেন, না শাস্তি দেবেন, সে ব্যাপারে তোমার কিছু করার নেই; কারণ তারা তো সীমালঙ্ঘনকারী। আকাশে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সুরা আল ইমরান, ৩:১২৮-১২৯/

ঝ. তিনি মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা) সম্পর্কে দীর্ঘ একটি দোয়া করেছিলেন। আমরা এ বিষয়ে পরে বিশদ আলোচনা করব। ঞ. সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আছে, মক্কা বিজয়ের পর নবিজি (সা) বলেছিলেন, “মক্কার প্রত্যেকটি গাছকেই হারাম হিসেবে গণ্য করতে হবে। মক্কার কোনো গাছ থেকে কেউ যেন একটি পাতাও না ছেঁড়ে।”

একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চাচা আব্বাস (রা) বলেন, “হে আল্লাহর রসুল, দয়া করে “ইদখিরের’ (লেমনগ্রাস) জন্য এ নিয়মের ব্যতিক্রম করার অনুমতি দিন, কারণ এটি আমরা মসলা হিসেবে ব্যবহার করি।” তখন নবিজি বললেন, “ঠিক আছে, ইদখির বাদে মক্কার অন্য সব গাছের পাতা ছেঁড়া নিষেধ।” এটি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। সুতরাং আমরা বলতে পারি, আল্লাহ মহানবি মুহাম্মদকে (সা) অনেক বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেওয়ার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন, তাঁকে শরিয়তের বিধান প্রণয়নের অধিকার দিয়েছেন। নবিজির (সা) ৫০টিরও বেশি ক্ষেত্রে ইজতেহাদ করার উদাহরণ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কিছু সেক্যুলার, কিছু আধা-সেক্যুলার/আধা-ধর্মীয়, কিছু সম্পূর্ণ ধর্মীয় রীতিবিষয়ক, এমনকি কিছু ধর্মতত্ত্ববিষয়ক ।

মহানবি (সা) অবশ্যই একজন মানুষ ছিলেন। তবু তাঁর প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি আল্লাহ আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেছেন। সুতরাং তিনি ধর্মের বিষয়ে যা কিছু বলেছেন তার সবই আমাদের মেনে চলতে হবে। যদি তিনি কোনো বিধানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম করার সিদ্ধান্ত দেন, তবে তা করার সম্পূর্ণ অনুমতি তাঁর রয়েছে; তা শোনা এবং মেনে চলা আমাদের বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে। সহজ করে বললে, নবিজির (সা) প্রতিটি ইজতেহাদই বাধ্যতামূলক, যতক্ষণ না আল্লাহ তায়ালা তা সংশোধন বা পরিবর্তনের করার জন্য ওহি নাজিল করেন। আমরা তাঁর ইজতেহাদকে অনুসরণ করব, কারণ তা করার বিষয়ে পবিত্র কোরানে ৬০টিরও বেশি আয়াত রয়েছে।

Leave a Comment