বদরের যুদ্ধ মুবারাজা | বদরের যুদ্ধ-৩, আগেই উল্লেখ করেছি, উতরাই প্রথম মুবারাজা শুরু করেছিল। মুবারাজা হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে উন্মুক্ত যুদ্ধ। সেই সময় আরবদের মধ্যে যেভাবে যুদ্ধ হতো তা হলো: দুই বাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে মূল যুদ্ধ শুরু করার আগে দুই পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি একে অপরের সাথে দ্বৈরথ করত। তবে মুবারাজার জন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের নেওয়া হতো না। কারণ, শুরুতেই জ্যেষ্ঠ নেতাদের হারালে যে কোনো দলেরই মনোবল ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সেজন্য সাধারণত দ্বিতীয় স্তরের ব্যক্তিদের মধ্য থেকেই এই দ্বৈরথ পর্বের জন্য বাছাই করা হতো।
বদরের যুদ্ধ মুবারাজা | বদরের যুদ্ধ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন
কুরাইশদের পক্ষ থেকে যাদেরকে বাছাই করা হয়েছিল।
(১) উতবাহ ইবনে রাবিয়া,
(২) উতবার ছোট ভাই শায়বা ইবনে রাবিয়া, এবং
(৩) উতবার পুত্র আল-ওয়ালিদ ইবনে উতবা ।

এরা ছিল কুরাইশদের দ্বিতীয় স্তরের নেতা, আবু জেহেলের এক স্তর নিচের। উতবা ও শায়বার কিছুটা বয়স হয়ে গিয়েছিল; সম্ভবত তাদের বয়স ছিল পঞ্চাশের কোঠার শেষের দিকে অথবা ঘাটের কোঠার শুরুর দিকে। প্রথমেই তারা তিনজন এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে মুসলিমদের দিকে উদ্দেশে বলে উঠল, “কে আছ আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে?” সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে যে তিনজন আনসার যুবক আগ্রহ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তাঁরা হলেন:
(১) আউফ ইবনে আল-হারিস: তিনি আওফ ইবনে আফরা নামেও পরিচিত ছিলেন;
(২) মুয়াবিদ ইবনে আল-হারিস। তিনি মুয়াবিদ ইবনে আফরা নামেও পরিচিত ছিলেন; এবং
(৩) আবদুল্লাহ ইবনে রাওহা ।
আনসার যুবকরা উৎসাহের সঙ্গে জবাব দিলেন, “আমরা আপনার সাথে যুদ্ধ করব।” উতবা জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কারা?” যুবকরা তাঁদের পরিচয় দেওয়ার পর উতবা বলল, “তোমাদের সঙ্গে তো আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যাও নেই। আমরা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসিনি। এমনকি আমরা তোমাদের চিনিও না। কেন আমরা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাব? আমরা আমাদের রক্ত-সম্পর্কিতদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছি।”
এবারও তারা জাহেলি ভাবধারায় চিন্তা করছে। এমনকি তারা আনসারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বিষয়ে কোনো কার্য-কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। ইমানের বন্ধন যে রক্তের বন্ধনের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে, তা বিন্দুমাত্রও তাদের ভাবনাচিন্তায় আসছে না। তারা যা বলতে চাচ্ছে তার মোদ্দাকথা হলো, ‘আমাদের নিজেদের লোকদের যুদ্ধ করতে পাঠাও।’ তারা জোর দিয়ে বলল, “হে মুহাম্মদ, আমাদের সমান যোগ্য লোকদেরকে পাঠাও।”
এ কথা শুনে নবিজি (সা) ডাকলেন, “ও উবায়দা ইবনুল হারিস, ও হামজা, ও আলি!”
এই তিনজনের পুরো নামগুলো হলো:
(১) উবায়দা ইবনুল হারিস ইবনুল মুত্তালিব,
(২) হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, এবং
(৩) আলি ইবনে আবি তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিব।
এবার নবিজি (সা) যে তিনজনকে বাছাই করলেন তাঁরা সবাই উচ্চ বংশের এবং কুরাইশ উপজাতির উত্তরা জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কারা?” যেহেতু তারা অনেক দূরে ছিলেন, তাই কুরাইশদের দিক থেকে তাদেরকে চেনা যাচ্ছিল না। তাঁরা তিনজনেই নিজের পরিচয় দিলে উতবা নামগুলো শুনে বলল, “তোমরা অভিজাত প্রতিপক্ষ। এসো, এবার আমরা যুদ্ধ করি।”
উবায়দা ইবনুল হারিস ইবনে আল-মুত্তালিব ইবনে আবদ মানাফ ছিলেন এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি। আল-মুত্তালিব ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের চাচা। সেই সুবাদে উবায়দা ছিলেন নবিজির (সা) চাচা, তাঁর পিতা আবদুল্লাহর চাচাতো ভাই। তিনি কিন্তু বনু হাশিম নন, কারণ হাশিম ছিলেন আল-মুত্তালিবের ভাই । তবে তিনি বনু আবদ মানাফের বংশধারার একজন কুরাইশ।
তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক হওয়ার কারণে উবায়দা উতবার দিকে গেলেন । হামজা গেলেন উতবার ছোট ভাই শায়বার কাছে, এবং দুই যুবক আলি এবং আল-ওয়ালিদ গেলেন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। উল্লেখ্য, এটি ইবনে ইসহাকের ভাষ্য, যদিও কয়েকটি হাদিসগ্রন্থে ভিন্ন জুটির কথা উল্লেখ রয়েছে। হামজা ও আলি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে প্রথম আঘাতেই কুপোকাত করে ফেলেন এবং নিজেদের গায়ে কোনো আঘাত লাগা ছাড়াই তাদের হত্যা করেন। অন্য দ্বৈরথে উতবা উবায়দার পা কেটে ফেলে। ফলে উবায়দা মাটিতে পড়ে যান। উতবা যখন উবায়দাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়, ঠিক সেই সময় হামজা ও আলি উবায়দাকে উদ্ধার করেন এবং উতবাকে হত্যা করেন। উতবা নিজেসহ তার পরিবারের তিনজন সবাই মারা গেল শুধু এই কারণে যে তাকে আবু জেহেল কাপুরুষ বলে অপমান করেছিল।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে বদরের যুদ্ধে সংঘটিত এই মুবারাজার কথা উল্লেখ করেছেন:
“(মুমিন ও কাফের) দুটি দল তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে বিতর্ক করে।” [সুরা হজ, ২২:১৯]। অধিকাংশ তাফসির পণ্ডিতের মতে এই আয়াতটি মুবারাজা সম্পর্কেই নাজিল হয়েছিল, যার ব্যাখ্যা এরকম: একদল তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে একটি অবস্থানে রয়েছে, অন্য দলটি ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। আলি (রা) বলতেন, “যেহেতু আমি বদরের যুদ্ধে প্রথম শত্রুকে ঘায়েল করেছি, সেহেতু এই আয়াতটি আমার সম্পর্কেই নাজিল হয়েছে।”
অতঃপর হামজা ও আলি উবায়দাকে কাঁধে বহন করে মুসলিম শিবিরে নিয়ে এলেন। উতবার আঘাতে তার পায়ের পুরোটা কাটা পড়েছিল। একজন বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে তিনি এত বড় ধকল সইতে পারেননি। ক্ষতের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে না পারায় উবায়দা কয়েকদিন পর যুদ্ধপরবর্তী শহিদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন। মুবারাজা শেষে মুসলিমদের দল প্রতিপক্ষের তিন মুশরিককে পরাভূত করে নিরাপদে তাঁদের শিবিরে ফিরে এসেছিলেন। এর ফলে মুসলিমদের মনোবল অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
