ইসরা ও মিরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ও অলৌকিক ঘটনা। এটি সংঘটিত হয় হিজরতের প্রায় এক বছর আগে, রজব মাসের ২৭ তারিখে বলে অধিকাংশ আলেম মত প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনায় আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ ﷺ-কে এক রাত্রিতে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসে নিয়ে যান—এ অংশকে বলা হয় ইসরা। এরপর সেখান থেকে আকাশসমূহ অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গমন করানো হয়—এ অংশটি মিরাজ নামে পরিচিত।
ইসরা ও মিরাজের ঘটনা কেবল ভ্রমণ নয়; এটি ছিল রাসূল ﷺ-এর সম্মান বৃদ্ধি, উম্মতের জন্য শিক্ষা ও ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রাপ্তির উপলক্ষ। এই রাতেই মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়, যা ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। নামাজ মূলত মিরাজের উপহার, যা একজন মুমিনের জন্য প্রতিদিনের আত্মিক মিরাজ।
এই ঘটনা মুসলমানদের ঈমানের পরীক্ষাও বটে। কারণ এটি মানব বুদ্ধির সীমার বাইরে হলেও আল্লাহর কুদরতের সামনে অসম্ভব কিছুই নয়। ইসরা ও মিরাজ আমাদের শেখায়—কঠিন সময়ের পর আল্লাহর সাহায্য ও সম্মান অবশ্যম্ভাবী। তাই এই ঘটনা মুমিনদের জন্য আশা, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসার অনন্য শিক্ষা বহন করে।
Table of Contents
রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ- পর্ব ১
“দুঃখের বছর’ এবং তায়েফের কষ্টকর অভিজ্ঞতা বা পরীক্ষার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবি করিমকে (সা) একটি বড় রকমের মিরাকল দান করেন। আল্লাহ পবিত্র কোরানে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি আমাদের পরীক্ষা করেন না যদি-না তিনি তার পরে স্বস্তি দেন। সুরা ইনশিরায় আল্লাহ বলেছেন, “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে।”
[৯৪:৫-৬) তিনি আরও বলেছেন, ধৈর্যশীলেরা ধৈর্যের সুফল ভোগ করবে। সুতরাং নবিজির (সা) জীবনে সবচেয়ে কষ্টকর ও দুর্বিষহ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে আল্লাহ যে তাঁকে অনেক বড় কোনো উপহার দেবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। আমরা জানি, নবিজির (সা) জীবনে একাধিকবার উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু পরপর কয়েকটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পর এবারের মিরাকলটি মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর রসুলের (সা) জন্য একান্ত ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া উপহার, যা কোনো উম্মতের জন্য নয়। এই বিশেষ উপহারটি হলো ‘আল ইসরা ওয়াল মিরাজ’: রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ। বিশেষ এই ঘটনাটি পবিত্র কোরানে দুই স্থানে উল্লিখিত আছে।
আল-ইসরা ও আল-মিরাজ কী?
ভাষাতাত্ত্বিকভাবে আরবি ইসরা শব্দের অর্থ ‘রাতের ভ্রমণ’। আল-ইসরা অর্থ ‘রাতের ভ্রমণটি’ (অর্থাৎ রাতে যে ভ্রমণটি সংঘটিত হয়েছে)। কিন্তু ইসলামি পরিভাষায় কিংবা সিরাহের বর্ণনায় আল-ইসরা (বা সংক্ষেপে ইসরা) বলতে আমরা বুঝি নবিজির (সা) মক্কা থেকে জেরুসালেম যাওয়ার রাতের ভ্রমণটি শব্দের অর্থ যে বস্তু বা যন্ত্রের সাহায্যে ওপরে ওঠা যায়। অতএব আল-মিরাজ অর্থ ‘ওপরে উঠতে ব্যবহৃত যন্ত্রটি’। আমরা ওপরে যেমন লিফট ব্যবহার করি তেমনটি বলা যেতে পারে।
এটি এমন একটি যন্ত্র বা সরঞ্জাম যা কোনো ব্যক্তিকে ওপরে উঠতে সাহায্য করে। ভাষাতাত্ত্বিকভাবে আল-মিরাজ (বা সংক্ষেপে মিরাজ) বলতে একটি সরঞ্জামকে বোঝালেও ইসলামি কিংবা সিরাহের পরিভাষায় আমরা এটি দিয়ে নবিজির (সা) উর্ধ্বলোকে আরোহণের ঘটনাটি বুঝে থাকি। সুতরাং ইসরা হলো নবিজির (সা) মক্কা থেকে জেরুসালেম যাত্রা, যা ঘটেছিল রাতের বেলা; আর মিরাজ হলো তাঁর জেরুসালেম থেকে ঊর্ধ্বলোকে যাত্রা।

পবিত্র কোরানে ইসরা ও মিরাজ :
পবিত্র কোরানে দুটি পৃথক সুরায় ইসরা ও মিরাজের উল্লেখ আছে। ইসরার জন্য আল্লাহ একটি সম্পূর্ণ সুরা নাজিল করেছেন। ‘আল-ইসরা (অথবা, ‘বনি ইসরাইল’) নামের সুরাটি শুরু হয়েছে বিখ্যাত এই আয়াতটি দিয়ে। “পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে তাঁর নিদর্শন দেখাবার জন্য রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদ আল-হারাম থেকে মসজিদ আল-আকসায়, যেখানকার পরিবেশকে আমি করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্য। তিনি তো সব শোনেন, সব দেখেন।” [১৭:১] এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তিনি প্রশংসার যোগ্য। ‘সুবহানা অর্থ ‘সমুচ্চ’ (বা ‘উন্নত’)।
শব্দটির আরেকটি অর্থ ‘অপূর্ণতা থেকে মুক্ত’ (অর্থাৎ ‘তার কোনো দোষ বা ত্রুটি নেই’। সুতরাং আমরা বলি, ‘সমস্ত মহিমা (প্রশংসা) তাঁর জন্য’ কারণ তিনি তাঁর বান্দাকে অলৌকিক ভ্রমণ দিয়ে রহমত করেছেন। অন্য কথায়, আল্লাহ বলেছেন, এই ভ্রমণের কারণে তিনি প্রশংসা ও সম্মান পাওয়ার যোগ্য। এ থেকেই বোঝা যায়, ভ্রমণটি কত অলৌকিক, মহিমান্বিত ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
“যিনি তাঁর বান্দাকে”—এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ‘আব্দ’ (বান্দা বা দাস) শব্দটির মাধ্যমে তাঁর রসুলের (সা) সর্বোচ্চ প্রশংসা করেছেন। সুরা জারিয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “আমি আমার ইবাদতের জন্যই মানুষ ও জিন সৃষ্টি করেছি। [৫১:৫৬] সুতরাং আল্লাহ সুরা ইসরায় স্বীকৃতি দিচ্ছেন যে, রসুল (সা) তাঁর ইবাদতের ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জন করেছেন। আমাদের নবিজির (সা) মতো পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ইবাদত কেউ করতে পারেনি।
ইবনে তাইমিয়াহ বলেন, “আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল আমাদের নবিজিকে (সা) তাঁর নাম ধরে না ডেকে তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন উপাধিতে ডেকেছেন।” এমনকি আমেরিকায়ও আমরা নাম উল্লেখ না করে ‘মি. প্রেসিডেন্ট’, ‘মি. সিনেটর’ ‘ইয়োর এক্সিলেন্সি’ ইত্যাদি শব্দমালা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্মান জানাতে ব্যবহার করে থাকি। এটি আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। আল্লাহ সুবহানাহ ওয়া তায়ালা রসুলকে (সা) কখনও কখনও নাম দ্বারা সম্বোধন করলেও প্রায়শই তাঁকে উপাধি দ্বারা সম্বোধন করেছেন।
‘আবদুল্লাহ’, ‘আবদিহি’ ইত্যাদি ৭২;১৯ (১৭:১] (১৮-১) উপাধির মাধ্যমে বোঝা যায়, তিনি আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণতা অর্জন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন, তিনি মসজিদ আল-আকসা ও তার আশেপাশের এলাকার ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন। ইসরা সম্পর্কে আল্লাহ আমাদের বলছেন, তিনি তাঁর বান্দাকে বিস্ময়কর অলৌকিক নিদর্শনগুলো প্রদর্শন করাতে চেয়েছেন। এখানে ‘প্রদর্শন করানো কথাটি আরবিতে একবচন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তার মানে হলো, ইসরার পুরো ভ্রমণটি ছিল শুধু নবিজির (সা) জন্য। আমাদের কেবল বিশ্বাস করতে হবে যে, ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছে।
মিরাজের কথা আল্লাহ তায়ালা সুরা আন-নাজমে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
“তিনি যা দেখেছেন তাঁর হৃদয় তা অস্বীকার করেনি। তিনি যা দেখেছেন তোমরা কি সে সম্বন্ধে বিতর্ক করবে? নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন, শেষ সীমান্তে অবস্থিত সিদরা গাছের নিকটে, যার কাছেই ছিল জান্নাতুল মাওয়া (আশ্রয় উদ্যান)। তখন সিদরাহ গাছটা আচ্ছাদিত ছিল যা দিয়ে আচ্ছাদিত থাকে। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি বা দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের অন্যতম নিদর্শনগুলো দেখেছিলেন।”
[৫৩:১১-১৮] সুরা ইসরা ও সুরা নাজম উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহ তায়ালা প্রায় একই শব্দগুচ্ছ বা বাক্যাংশ—’যাতে আমরা তাঁকে আমাদের লক্ষণগুলো দেখাতে পারি’—ব্যবহার করেছেন। সুতরাং আমরা বলতে পারি, ইসরা ও মিরাজ ছিল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে শুধু নবিজির (সা) একার জন্য একটি ব্যক্তিগত উপহার, যা ছিল তাঁর জন্য বরকতস্বরূপ। এই উপহার দেওয়ার সময়টিও ছিল একদম উপযুক্ত। আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো ব্যক্তিকে পরীক্ষা করেন, এবং সেই ব্যক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তখন কখনো কখনো তিনি সে পরীক্ষার ফল বা পুরস্কারের স্বাদ ওই ব্যক্তিকে সঙ্গে সঙ্গেই পাইয়ে দেন।

ইসরা ও মিরাজের বিবরণ সংক্রান্ত ইস্যু
ইসরা ও মিরাজের ঘটনা একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছুটা সমস্যাপূর্ণ। এর বেশ কয়েকটি কারণ আছে। এই ঘটনা নিয়ে ২০ জনেরও বেশি সাহাবির বর্ণনায় অসংখ্য হাদিস আছে। শুধু সহিহ বুখারিতেই ছয়জন সাহাবির বর্ণনা রয়েছে। আমরা যদি মক্কার সময়ের সব হাদিস ইসরা ও মিরাজ ছাড়া সংকলন করি এবং শুধুমাত্র ইসরা ও মিরাজের হাদিসগুলো আলাদাভাবে সংকলন করি, তাহলে পরের অংশটিই বড় হবে।
এ বিষয়ে অনেক হাদিস থাকার কারণে কিছু কিছু সমস্যারও সৃষ্টি হয়েছে:
১) বর্ণনাকারীদের দ্বারা কাহিনির অতিরঞ্জন:
ইসরা ও মিরাজের ঘটনা সম্পর্কে প্রথম দিকের কাহিনিকাররা যেসব বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন সেগুলোর একটি বড় অংশ ছিল অতিরঞ্জিত। অনেক অখ্যাত বইতে বিবৃত এসব কাহিনির অনেক কিছুই আসলে মনগড়া । ইসলামের প্রথম যুগে নবিজিকে (সা) নিয়ে অনেক কাহিনি একাডেমিকভাবে যাচাই-বাছাইয়ের আগেই অনেক লোক মসজিদে মসজিদে জনসাধারণের মাঝে বিভিন্ন মুখরোচক গল্প আকারে প্রচার করতেন। অনেক কাহিনি ছিল নির্জলা মিথ্যা ও বানোয়াট।
কিছু ব্যক্তি কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য এসব করতেন। সেইসব কাহিনির কিছু কিছু এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সেগুলো পরবর্তীকালে ইসলামি সাহিত্যের অংশ হয়ে ওঠে। বেশি জনপ্রিয়তা পায় ইসরা ও মিরাজ সম্পর্কিত কাহিনিগুলো। একটা সময়ে ইসলামি পণ্ডিত ও গবেষকরা এসব কাহিনির প্রচারে ব্রাশ টেনে ধরেন। কোনো বিষয় বা ঘটনা বাস্তব সত্য কি না তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা দেখলেই বিষয়ের সঠিকতা সম্পর্কে বুঝতে পারা যায় ।
২) ক্রোনোলজি বা কালানুক্রম:
ইসরা ও মিরাজ সম্পর্কে আমাদের কাছে অনেক টুকরো টুকরো গল্প বা কাহিনি আছে। কিন্তু এগুলো সঠিক কালানুক্রমে সাজানোই মূল সমস্যা। কাহিনির ছোট ছোট অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, কিন্তু সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সময়ের ছকে ফেলা সত্যিই খুব কঠিন। সাহাবিদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রায় ২০ সাহাবি ইসরা ও মিরাজ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। ঘটনাগুলোর সময়রেখার নিয়ে কখনও কখনও তাঁদের মধ্যে মতভিন্নতাও ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, জিব্রাইল (আ) নবিজিকে (সা) দুটি পাত্র একটিতে দুধ, অন্যটিতে মদ সহ তুলে দিয়ে সেখান থেকে একটি বেছে নিতে বলেছিলেন। একটি ভাষ্য অনুসারে, এই ঘটনা ঘটেছিল বায়তুল মাকদিসে অবস্থানের সময়। আবার অন্য এক ভাষ্য অনুসারে, এটা ঘটেছিল ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণের সময়। দুই ভাষ্যই সঠিক। এখন সমস্যা হলো, আমরা এ দুইয়ের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করব? স্পষ্টতই দুটি বর্ণনার একটি সঠিক। কোনটা সঠিক তা আমরা কীভাবে বুঝতে পারব? কিছু স্কলার বলেছেন, ঘটনাটি দুবার ঘটেছে। অন্যরা বলেছেন, আমরা যেটার পরম্পরা শক্তিশালী সেটা গ্রহণ করব। সুতরাং স্কলারদের জন্য এর সুরাহা করা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ইসরা ও মিরাজ সম্পর্কে বিবরণের এত বেশি ভিন্নতা থেকে কোনো কোনো স্কলার (যেমন: ইমাম আল-নওয়াবি ও ইবনে আবি জামরা) এই ধারণায় পৌঁছেছিলেন যে, একাধিকবার (সম্ভবত দুবার) ইসরা ও মিরাজের ঘটনা ঘটেছিল। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনার সমন্বয় করতে না পারার কারণেই তাঁরা এরকম মত দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। যা-ই হোক, আমি (ইয়াসির কাদি) সহ সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হলো, ইসরা ও মিরাজের ঘটনা একবারই ঘটেছিল। আল্লাহ তায়ালা সুরা ইসরায় স্পষ্টভাবেই একবচনে ‘একটি রাতের কথা উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, ইসরা ও মিরাজ কেবল একবারই ঘটেছে। এখানে কালানুক্রমের ক্ষেত্রে যদি কোনো ত্রুটি থাকে, তবে সে ত্রুটি দূর করার চেষ্টা করতে হবে।

ইসরা কখন সংঘটিত হয়েছে?
ইসরা কবে সংঘটিত হয়েছে সে বিষয়ে সাহাবিদের কাছ থেকে কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি। আমরা মূলত তাবেয়িন ও তাবেয়ি তাবেয়িনদের কাছ থেকে এ বিষয়ে জানতে পারি। তবে ইবনে ইসহাকসহ প্রথম দিকের বেশিরভাগ লেখকের মত অনুসারে, ঘটনাটি ঘটেছিল হিজরতের এক বছর আগে। এটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত। অন্য কিছু স্কলারের মতে, ঘটনাটি হিজরতের দেড়, দুই কিংবা পাঁচ বছর আগে ঘটেছিল।
আয়েশার (রা) কাছ থেকে পাওয়া একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র আছে, যা থেকে আমরা ইসরার সময়কাল নিয়ে অন্যান্য মত খণ্ডন করতে পারি। আয়েশার (রা) ভাষ্য অনুসারে, মুসলিমদের জন্য নামাজ ফরজ হওয়ার আগেই খাদিজা (রা) মৃত্যুবরণ করেন। আমরা জানি, ইসরা ও মিরাজের সময়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিমদের জন্য নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশনা আসে। এ থেকে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়, ইসরা ও মিরাজের ঘটনাটি মক্কার যুগের শেষ দেড় বছরের মধ্যে, অর্থাৎ দুঃখের বছরের পরে এবং হিজরতের আগে ঘটেছিল। এটিই সংখ্যাগরিষ্ঠ স্কলারের মত।
ইসরা ঠিক কোন মাসে সংঘটিত হয়েছিল সে বিষয়ে প্রথম যুগের স্কলারদের কাছ থেকে তেমন কিছু জানা যায়নি। কিছু স্কলার বলেছেন রবিউল আউয়াল, কেউ বলেছেন রবিউস সানি, কেউ বলেছেন রাব, কেউ বলেছেন রমজান, আবার কেউ বা বলেছেন শাওয়াল। কিন্তু এর মধ্যে কোনোটির পক্ষেই সাহাবি কিংবা তাবিয়িন থেকে প্রাপ্ত কোনো প্রমাণ নেই। দিনের কথা তো দূরে থাক, সঠিক মাসটিও আমরা জানি না। প্রায় সব বর্ণনাই এসেছে ঘটনার ২০০ বছর পর থেকে। সাহাবিদের কাছে তারিখ-সংক্রান্ত কোনো রেকর্ড না থাকায় ধারণা করা যায়। যে, এই বিষয়টি তাঁদের ভাবনার মধ্যে ছিল না। অর্থাৎ তাদের কাছে ঘটনার বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তারিখ নয় ।

ইসরার শুরু কোথা থেকে?
মহানবী হযরত-মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন, ইসরা কোথা থেকে শুরু হয়েছে তা নিয়ে অনেক মত রয়েছে। সহিহ বুখারিতেই দুটি আলাদা বর্ণনা রয়েছে:
প্রথম বর্ণনা অনুসারে, নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি যখন হাতিমে ঘুমাচ্ছিলাম, তখন জিব্রাইল (আ) আমার কাছে এলেন।” এটিই বেশি অথেনটিক। [প্রসঙ্গ ক্রমে উল্লেখ্য, হাতিম কাবাঘরের বাইরে অর্ধবৃত্তাকার জায়গা যা কুরাইশরা কাবার সময় তৈরি করেছিল। হাতিম সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার বিষয়টি আল্লাহ তায়ালার অপার প্রজ্ঞার পরিচায়ক, কারণ হাতিয়ে প্রার্থনা করা মূলত কাবাঘরের ভেতরে প্রার্থনা করারই শামিল। আমরা বিষয়টি ৯ম পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।]
দ্বিতীয় বর্ণনা অনুসারে, নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি যখন আমার বাড়িতে ছিলাম, আমি দেখলাম যে (আমার মাথার ওপরে) ছাদটি খুলে গেল, এবং জিব্রাইল (আ) আমার কাছে এলেন।” ইবনে হাজার দ্বিতীয় বর্ণনাটি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন: জিব্রাইল (আ) নবিজির (সা) বাড়িতে এসে প্রথমে তাঁকে দুই রাকাত নামাজ পড়ার জন্য কাবা শরিফে নিয়ে যান; সেখান থেকে তিনি তাঁকে নিয়ে ইসরা (রাতের ভ্রমণ) শুরু করেন।
এই ব্যাখ্যাটি বিশ্বাসযোগ্য। কারণ মক্কায় বাড়ি থাকতে নবিজি (সা) কেন হাতিয়ে খোলা জায়গায় ঘুমাতে যাবেন? এইভাবে স্কলাররা কখনো কখনো দুটি আপাতবিরোধী মতের সমন্বয় করার চেষ্টা করেন।

আল ইসরা
বক্ষ উন্মুক্তকরণ এর পরের ঘটনা নবি করিমের (সা) বক্ষ উন্মুক্তকরণ। নবিজি (সা) বলেছেন, “জিব্রাইল (আ) হাতিমে আমার বক্ষ উন্মুক্ত করেন । তিনি স্বর্ণের তৈরি একটি বাটি নিয়ে আসেন যা জমজমের পানি দ্বারা পূর্ণ ছিল। তিনি আমার হৃৎপিণ্ড বের করে। এনে তা ধুয়ে আবার একই জায়গায় স্থাপন করেন।” আরেকটি ভাষ্য অনুসারে, বাটিটি ইমান দ্বারা পূর্ণ ছিল। এখানে কোনো বৈপরীত্য নেই, কারণ বাটিতে জমজমের পানি থাকলেও তা তাঁর ইমান বৃদ্ধি করেছে।
লক্ষ করুন, এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নবিজির (সা) বক্ষ উন্মুক্ত করার ঘটনা ঘটল। প্রথমবার ঘটেছিল তাঁর চার-পাঁচ বছর বয়সে। সেবার তাঁর হৃৎপিণ্ডে একটি কালো দাগ ছিল, সেটা ধুয়ে মুছে ফেলা হয়েছিল। দ্বিতীয়বার কোনো কালো দাগ ছিল না, কারণ আগেই তা দূর করে ফেলা হয়েছে। এবার নবিজির (সা) হৃৎপিণ্ড ধোয়ার উদ্দেশ্য ছিল, তিনি ইসরা ও মিরাজে যা দেখতে যাচ্ছিলেন তার জন্য তাকে প্রস্তুত করা। ইবনে হাজম বলেছেন, তিনি যা দেখেছিলেন তার একটি অংশও যদি অন্য কোনো মানুষ দেখতে পেতেন, তবে তিনি পাগল হয়ে যেতেন। আল্লাহ তায়ালা সুরা নাজমে বলেছেন: “তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি বা দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি।” [23:19] প্রকৃতপক্ষে, ইসরা ও মিরাজের যাত্রায় নবিজি (সা) একটি ভিন্ন জগতে প্রবেশ করেছিলেন।
আল ইসরা: বোরাকে আরোহণ
নবি করিম (সা) বলেছেন, “জিব্রাইল (আ) আমার জন্য একটি প্রাণী নিয়ে এসেছিলেন। সেটি ছিল আকারে খচ্চরের চেয়ে ছোট কিন্তু গাধার চেয়ে বড়। প্রাণীটি ছিল বিশুদ্ধ সাদা রঙের, নাম আল বোরাক (আরবি মূল ধাতুরূপের অর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎ)। চলার সময় সে তার খুর দেখতে পেত।” বোরাকের আকার নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে অনেক গল্প-কাহিনি প্রচলিত আছে। আমরা ডানাওয়ালা বোরাকের বহুল প্রচলিত যে ছবিটি দেখতে পাই তা মোটেও সত্য নয়। হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে, বোরাক রক্ত-মাংসের তৈরি একটি সত্যিকারের দেহবিশিষ্ট প্রাণী, যা একটি সাধারণ ঘোড়ার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে চলতে পারে। এত দ্রুত চলতে পারে যে, যতদূর চোখ যায় এক লাফেই সেখানে পৌঁছতে সক্ষম।
তিরমিজিতে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, বোরাকের একটি লাগাম (হারনেস) এবং তার পিঠে জিন (স্যাডল) ছিল। জিব্রাইল (আ) লাগাম চেপে ধরলে রসুল (সা) বোরাকে আরোহণ করেন। আরও বর্ণিত আছে, বোরাক প্রথমে কিছুটা লাফিয়ে উঠেছিল। এতে জিব্রাইল (আ) লাগাম শক্ত করে চেপে ধরে বোরাককে বলেন, “আফসোস তোমার জন্য! তুমি কি লজ্জা পাও না? আল্লাহর কসম, তোমার বর্তমান আরোহীর চেয়ে আল্লাহর দৃষ্টিতে অধিক সম্মানীয় আর কেউ কখনও তোমার ওপর সওয়ার হয়নি।”
এ থেকে ধারণা করা যায়:
(ক) অন্য কোনো সৃষ্টি কিংবা আরোহী ইতিপূর্বে বোরাকটিতে সওয়ার হয়েছিল।
(খ) বোরাক একটি দেহবিশিষ্ট প্রাণী, কারণ সেটি যে কোনো সাধারণ প্রাণীর মতোই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
(গ) আল্লাহ আমাদের জানার বাইরেও অনেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন। তিনি পবিত্র কোরানে বলেছেন, “তোমাদের আরোহণের জন্য ও শোভার জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা। আর তিনি সৃষ্টি করেন এমন অনেক কিছু যা তোমরা অবগত নও।” [সুরা নাহল, ১৬:৮] আমরা এর আগের পর্বে উল্লেখ করেছি, জিনদেরও প্রাণী আছে যা আমাদের এই পৃথিবীতেই বিরাজমান। তবু তাদের সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। বোরাকও হয়তো অন্য পৃথিবীতে বসবাসকারী একটি দেহবিশিষ্ট প্রাণী যার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না! সম্ভবত ইসরার জন্যই, এবং সম্ভবত একবারের জন্যই, বোরাকটিকে এই পৃথিবীতে আনা হয়েছিল। এ বিষয়ে আমরা কখনোই পুরোপুরি জানতে পারব না। এটি ইলমুল গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞান।
নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি তার ওপর চড়ে বসার পর সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল যতক্ষণ না আমরা বায়তুল মাকদিসে পৌঁছাই।” এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সেই সময়ে বায়তুল মাকদিসে কোনো কাঠামো (মসজিদ, সিনাগগ, টেম্পল ইত্যাদি) ছিল না। জেরুসালেম তখন রোমানদের অধীনে ছিল এবং রোমান সম্রাটের আদেশে এই পবিত্র টেম্পলের দর্শনীয় স্থানটি আবর্জনার স্তূপে পরিণত করা হয়েছিল। খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান দেখাতে চায়নি। ঐতিহাসিকভাবেই খ্রিষ্টানরা ইহুদি-বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিল। নবিজি (সা) এখানে এসে বায়তুল মাকদিসকে মূল অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্ভবত সেখানে সুলায়মানের (আ) মূল টেম্পলটি’ অথবা অন্য কিছু আনার ব্যবস্থা করেছিলেন, যেখানে নবিজি (সা) নামাজ পড়েন।
নবিজি (সা) বলেন, “অন্যান্য নবি যেখানে প্রাণীদের বেঁধে রাখত, আমি সেখানে বোরাককে বেঁধে রাখলাম।” এ থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, নবিজি (সা) সেখানে এমন একটি কাঠামো দেখেছেন যা এখনকার মানুষরা দেখতে পায় না। কারণ সুলায়মান (আ) যে খুঁটি ব্যবহার করেছিলেন তা ৩০০ বছর পরে আর দেখতে পাওয়ার কথা নয়। আল্লাহ এভাবেই তাঁর রসুলকে (সা) সশরীরে মূল বায়তুল মাকদিসই দেখিয়েছেন। এটি আল্লাহর ক্ষমতার বিষয়, যা আমাদের বোধের বাইরে।
আল ইসরা: পূর্ববর্তী সকল নবির সঙ্গে নামাজ আদায়
নবি করিম (সা) বলেছেন, “আমি বায়তুল মাকদিসের ভেতরে ঢুকে দুই রাকাত নামাজ পড়লাম।” এটা মুসলিমদের জন্য ‘তাহিয়াতুল মসজিদ” সম্পর্কিত বিধান * আসার আগে। এ থেকে বোঝা যায়, নবিজি (সা) ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন কিছু চর্চা করতেন যা উম্মতের জন্য তখন পর্যন্ত বিধান হিসেবে আসেনি। ঘটনার পরবর্তী বর্ণনায় আমরা কিছুটা পার্থক্য দেখতে পাই: একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবিজি (সা) দুই রাকাত নামাজ পড়ার পর যখন ঘুরে দাঁড়ালেন তখন দেখতে পেলেন যে, সব নবি তাঁর পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। এই বর্ণনা থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, তাঁর পেছনে নবিগণ যে দাঁড়িয়ে ছিলেন তা নবিজি (সা) জানতেন না ।
অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি নিজেকে অন্য নবিদের সঙ্গে দেখতে পেলাম। সেখানে মুসা (আ) নামাজ পড়ছিলেন। তিনি শানুহ গোত্রের মানুষদের মতো লম্বা, বলবান, পেশিযুক্ত ও বাদামি বর্ণের মানুষ ছিলেন। আমি ইসা ইবনে মরিয়মকে (আ) দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখলাম; আর যাঁর সঙ্গে ইসার (আ) সবচেয়ে বেশি মিল আছে তিনি উরওয়া ইবনে মাসউদ আল-সাকাফি।”
এখানে আমরা দেখছি, নবিজি (সা) তাঁর সাহাবিদের কাছে তাঁদের বোধগম্য ভাষায় অন্য নবিদের বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য বর্ণনা অনুসারে নবিজি (সা) বলেছেন, ইসা (আ) ফর্সা রঙের ছিলেন, যার অর্থ তিনি দেখতে ককেশিয়ানদের মতো ছিলেন (এখানে আরবিতে ‘লাল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ আরবরা সাদা মানুষদেরকে ‘লাল’ এবং কখনও কখনও ‘হলুদ’ বলে অভিহিত করত)। নবিজি (সা) আরও বলেছেন, “তাঁর চুল এমনভাবে জ্বলজ্বল করছিল যে মনে হচ্ছিল তিনি সদ্য স্নান সেরে এসেছেন। তিনি মুসার (আ) তুলনায় কিছুটা খাটো ছিলেন।” তারপর তিনি বলেছেন, “আমি ইব্রাহিমকে (আ) দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে দেখলাম। আর তাঁর সঙ্গে দেখতে যাঁর সবচেয়ে বেশি মিল। তিনি তোমাদেরই সাথী (অর্থাৎ নবিজি (সা) নিজেই)। ”
[অন্য একটি হাদিসে আছে, নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি নিজের চেয়ে ইব্রাহিমের (আ) সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে দেখতে পাইনি এবং ইব্রাহিমের (আ) চেয়ে বেশি আর কাউকে আমার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখতে পাইনি।” অর্থাৎ ইব্রাহিম (আ) এবং মহানবি মুহাম্মদ (সা) শারীরিকভাবে ছিলেন একে অপরের “আয়নার প্রতিবিম্ব’ দেখতে হুবহু একই রকম।
নবিজি (সা) আরও বর্ণনা করছেন, “এরপরে নামাজের সময় উপস্থিত হলে আমাকে তাঁদের ইমাম করা হলো।” অতএব এই ভাষ্য অনুসারে, সেখানে ঠিক কী হচ্ছিল নবিজি (সা) তা ভালো করেই জানতেন । ওপরে উল্লিখিত দুটি ভাষ্যের সমন্বয় করা কঠিন। আল্লাহ ভালো জানেন। তবে মূল কথা হচ্ছে, মহানবি মুহাম্মদ (সা) নামাজে নবিদের নেতৃত্ব
মৃত্যুর পরেও নবিগণ নামাজ পড়ছেন। এ থেকে আমরা নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। নবিজি (সা) বলেছেন, “আল ইসরায় যাওয়ার পথে যখন আমি মুসার (আ) কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আমি তাঁকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখলাম।” নামাজের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। [এখানে লক্ষণীয়, নবিজি (সা) ইসরা ও মিরাজের সময় মুসার (আ) সঙ্গে তিনবার সাক্ষাৎ করেন। তিনি ইসরার সময় দুবার সাক্ষাৎ করেছিলেন; একবার তাঁর কবরে, আরেকবার বায়তুল মাকদিসে। তারপর তৃতীয়বার সাক্ষাৎ করেছিলেন মিরাজের সময় ষষ্ঠ আকাশে। অর্থাৎ নবিজি (সা) মুসাকে (সা) কবরে দেখার পরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁকে (মুসাকে) বায়তুল মাকদিসে নিয়ে গিয়েছিলেন, এবং আরও পরে ষষ্ঠ আকাশে নিয়ে গিয়েছিলেন। মুসার (আ) বোরাকের প্রয়োজন ছিল না, কারণ তিনি ইতিমধ্যে পারলৌকিক জগতে আত্মিক অবস্থায় ছিলেন। এ বিষয়ে পরে আরও আলোচনা আছে ।]
নবি করিমের (সা) সকল নবির ইমাম হওয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে সম্মান দান করেছেন তার তুলনীয় আর কিছুই নেই। তিনি শুধু ‘সাইয়িদ আল-আনবিয়া” (নবিগণের নেতা) এবং ‘ইমামুল মুরসালিন’ই (রসুলদের ইমাম/নেতা) নন, তিনি সমগ্র উম্মতের নেতাও বটে। কারণ, প্রত্যেক নবিই নিজ নিজ উম্মতদের নেতা ছিলেন, এবং ইসরায় মহানবি মুহাম্মদ (সা) সব উম্মতের নেতাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আরেকটি হাদিস অনুসারে, তিনি বলেছেন, “কেয়ামতের দিন আমি সকল আদম সন্তানের ‘সাইয়্যিদ’ বা নেতা হিসেবে থাকব; আমি অহংকার করার জন্য এ কথা বলছি না।”
আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবিরা সবাই এক সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যেহেতু তাঁরা পারলৌকিক জগতে আত্মিক রূপে ছিলেন, তাই তাঁদের মধ্যে শারিরীক দূরত্বের কোনো বিষয় ছিল না। আক্ষরিক অর্থেই তাঁরা (১ লাখ ২০ হাজার নবি এবং ৩১০ জনের বেশি রসুল) সেখানে এক দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
এ থেকে এই বিষয়টিও প্রমাণিত হয় যে, সব নবিই এক রকম, যেমনটি কোরানে উল্লেখ করা হয়েছে: “আমরা তাঁর রসুলদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না।” [২:২৮৫] আবার কোরানের আরেকটি আয়াতে আছে: “এই রসুলদের মধ্যেও কাউকে কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [২:২৫৩] আমরা এই দুটি আয়াতকে এভাবে সমন্বয় করতে পারি: সব নবিই এক প্রতিপালকের ইবাদত করেন, মানবজাতির জন্য তাঁদের সবার বার্তা একই, তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর কাছে মর্যাদার বিচারে একে অন্যের চেয়ে উত্তম, এবং মহানবি মুহাম্মদ (সা) তাঁদের মধ্যে সেরা।
আল ইসরা সুখ বনাম মন
তারপর নবি করিম (সা) বলেছেন, “জিব্রাইল (আ) আমাকে দুটি পাত্র এনে দিলেন। একটিতে ছিল দুধ, অন্যটিতে ছিল মন।” (আনুষঙ্গিক দ্রষ্টব্য:
১. আগেই উল্লেখ করেছি, এখানে দুটি সঠিক বর্ণনার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। একটি ভাষ্যে জিব্রাইল (আ) বায়তুল মাকদিসেই নবিজিকে (সা) পার দুটি দিয়েছিল: অন্য ভাষ্যে জিব্রাইল (আ) উর্ধ্বলোকে যাওয়ার সময় এটা করেছিলেন।
২. সেই সময় পর্যন্ত মদ হারাম করা হয়নি।
জিব্রাইল (আ) নবিজির (সা) সামনে দুটি পাত্র তুলে ধরে বললেন, “বেছে নিন, এবং আপনার উম্মতের জন্য বেছে নিন।” অর্থাৎ দুধ আর মদের মধ্যে বেছে নেওয়ার বিষয়টি শুধু নবিজির (সা) জন্য নয়, তাঁর উম্মতদের জন্যও প্রযোজ্য হবে। নবিজি (সা) দুয়ের মধ্যে দুধ বেছে নিলেন। তখন জিব্রাইল (আ) বললেন, “আপনি “ফিতরা” বেছে নিয়েছেন।” এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী বিষয় আছে। সুধ ও মদের মধ্যে পার্থক্য খুবই স্পষ্ট।
প্রাণী থেকে দুধ খাঁটি হয়ে নিঃসরিত হয়, যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তাদের পেটের আঁতের ও রক্তের মধ্য থেকে পরিষ্কার দুধ বের করে আমি তোমাদেরকে পান করাই, যা যারা পান করে তাদের জন্য বিশুদ্ধ ও সুস্বাদু।” [সুরা নাহল, ১৬:৬৬] একটি হাদিসে আছে, “খাবার ও পানীয়র ক্ষেত্রে দুধের কোনো বিকল্প নেই।” সুতরাং দুধ পুষ্টিকর ও বরকতময় খাবার যা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে উল্লেখ করেছেন। নবিজিও (সা) দুধ খেতে ভালোবাসতেন।
অন্যদিকে মদ গাঁজনের মধ্য দিয়ে তৈরি একটি দূষিত, নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানীয়। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত করার মাধ্যমে মদ প্রস্তুত করা হয়। তা কী কাজে লাগে? মদ কি পুষ্টিকর? স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী? মোটেই না। মদ আপনাকে কলুষিত করে, আপনাকে বোকা বানায় । দুধ আর মদের মধ্যে নবিজি (সা) সেটাই বেছে নিয়েছেন যা বিশুদ্ধ, যা বিশুদ্ধ উৎস থেকে এসেছে এবং যা আমাদের বিশুদ্ধতা বজায় রাখে। এর বিপরীতে মদ কলুষিত, এবং তা দেহকে কলুষিত করে। তাই জিব্রাইল (আ) বলেছেন, “এটা আপনার উম্মতের জন্য।” (অর্থাৎ আপনার উম্মতও বিশুদ্ধ হবে, ফিতরার ওপর থাকবে)।
[আনুষঙ্গিক বিষয়: একটি হাদিসে আছে, নবিজি (সা) বলেছেন, “প্রতিটি শিশুই ফিতরার ওপরে জন্মগ্রহণ করে।” অর্থাৎ প্রতিটি শিশুই বিশুদ্ধ হিসেবে জন্য। নেয়, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভালো প্রবণতা, মন্দ নয়।]
আল মিরাজ:
আকাশের প্রবেশদ্বার দিয়ে আরোহণ এরপর নবিজি (সা) বলেছেন যে, জিব্রাইল (আ) আকাশের প্রবেশদ্বার খোলার জন্য দ্বাররক্ষীকে অনুরোধ করলেন।
দ্বাররক্ষী: আপনি কে?
জিব্রাইল (আ): আমি জিব্রাইল।
দ্বাররক্ষী: আপনার সঙ্গে কি আর কেউ আছে?
জিব্রাইল (আ): হ্যাঁ, আমার সঙ্গে মুহাম্মদ (সা) আছেন।
দ্বাররক্ষী: তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে (অর্থাৎ তাঁর কি অতিক্রম করার অনুমতি আছে)?
জিব্রাইল (আ) : হ্যাঁ।
তারপর দরজা খুলে দেওয়া হলো। একইভাবে সাতটি আকাশের প্রতিটির দ্বাররক্ষীর সঙ্গে জিব্রাইলের (আ) একই কথোপকথন হয়েছিল। এ থেকে বোঝা যায়, আকাশসমূহের প্রবেশদ্বার রয়েছে এবং প্রতিটি প্রবেশদ্বারে একজন করে দ্বাররক্ষী রয়েছেন। দ্বাররক্ষীকে অনুমতিপত্র না দেখাতে পারলে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। যেহেতু তাঁরা সবাই ফেরেশতা এবং মিথ্যা বলতে পারেন না, তাই ঢোকার জন্য কোনো বিশেষ সংকেতেরও প্রয়োজন নেই । জিব্রাইল (আ) শুধু হ্যাঁ বলছেন, আর দ্বারগুলো খুলে যাচ্ছে। আমরা এখন আল মিরাজের বর্ণনায় আছি। লক্ষ করুন, বোরাক এখনও খুঁটিতে বাঁধা আছে, যাতে মিরাজের পরে নবিজি (সা) মক্কায় ফিরে যেতে পারেন।

আকাশ সামা ও বেহেশতের জান্নাত মধ্যে পার্থক্য:
মিরাজ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করার আগে সাতটি আকাশ নিয়ে আমরা কিছুটা আলোচনা করব। এখানে আকাশ কথাটা যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তার মূল আরবি শব্দটি হলো ‘সামা’ (বহুবচন সামাওয়াত)। আর বেহেশত কথাটার মূল আরবি শব্দটি হলো ‘জান্নাহ’ (বহুবচন জান্নাত)। অনেকেই জান্নাহকে সামার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।
আসলে এগুলো দুটো পৃথক শব্দ এবং দুটি পৃথক আল্লাহ তায়ালা কোরানে উল্লেখ করেছেন, বিষয়। “তিনি (আল্লাহ) স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাতটি সামাওয়াত (আকাশ) সৃষ্টি করেছেন।” [সুরা মুল্ক, ৫৭:৩) এই সামাওয়াত হলো আমাদের ওপরে অবস্থিত বাস্তবের আকাশ। আমার (ইয়াসির কাদি) মতে, আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি অর্থাৎ কোটি কোটি তারকা ও গ্যালাক্সি, এ সবই রয়েছে আকাশের প্রথম ও সর্বনিম্ন স্তরের মধ্যে। কীভাবে আমরা এটা জানতে পারি? প্রথমত, আল্লাহ তায়ালা কোরানে বলেছেন, “আমি “সামা আল-দুনিয়াকে ‘ (নিম্নতম আকাশকে) প্রদীপমালায় সুশোভিত করেছি।”
[সুরা মুগ্ধ, ৫৭:৫] দ্বিতীয়ত, সহিহ বুখারি অনুসারে, নবিজি (সা) বলেছেন, “জিব্রাইল (আ) আমাকে ‘সামা আদ-দুনিয়া” শেষ না করা পর্যন্ত নিয়ে চললেন, তারপর তিনি প্রবেশদ্বার খোলার অনুমতি চাইলেন।” সুতরাং এ দুটো সমন্বয় করলেই আমরা উত্তর পেয়ে যাব। সামা আদ-দুনিয়া পেরিয়ে (অর্থাৎ আকাশের) দ্বিতীয় স্তর, তারপর তৃতীয় তব, এভাবে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সামা বিদ্যমান। এখন আলোচনা করা যাক, জান্নাত কী? জান্নাত (পুণ্যলোক, স্বর্গ, বেহেশত ) এমন স্থান যা মুমিনদের পুরস্কার হিসেবে প্রতিশ্রুত জান্নাত কোথায়? এর দুটো ব্যাখ্যা আছে।
একটি ব্যাখ্যা হলো, জান্নাত লক্ষ লক্ষ স্তর নিয়ে গঠিত এবং তা সপ্তম আকাশে অবস্থিত। আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, জান্নাত ষষ্ঠ স্তর থেকে শুরু হয়ে সপ্তম স্তর পর্যন্তধি বিস্তৃত। উভয় মতের পক্ষেই কিছু যুক্তি রয়েছে। এটি ‘ইলমুল গায়েব’ (অদৃশ্যলোকের জ্ঞান)। তবে এ কথা বলা যায়, জান্নাত সামাওয়াতের শীর্ষে অবস্থিত রয়েছে।

আল মিরাজ: নবিদের সম্ভাষণ:
নবি করিম (সা) আকাশে আরোহণের বিভিন্ন স্তরে যা যা ঘটেছিল:
প্রথম আকাশ:
সেখানে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলেন। নবিজি (সা) তাঁকে লম্বা ও বিশালকায় বলে বর্ণনা করেছেন। জিব্রাইল (আ) পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “ইনি আপনার পিতা আদম (আ)। তাঁকে সালাম দিন।” নবিজি (সা) সালাম জানালে আদম (আ) সাড়া দিয়ে বললেন, “হে আমার অভিজাত পুত্ৰা হে অভিজাত নবি! স্বাগতম!” একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবিজি (সা) সেখানে আলমকে (আ) ঘিরে অনেক মানুষকে দেখেছিলেন। তাঁর ডানদিকে ছিল একটি দল, বামদিকে অন্য একটি দল। আদম (আ) ডানদিকের মানুষদের দেখে খুশি হলেন, আর বামদিকের মানুষদের দেখে কাঁদতে লাগলেন। নবিজি (সা) এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে জিব্রাইল (আ) জবাব দিলেন, “এরা সবাই আদম সন্তান। ডান দিকের মানুষেরা জান্নাতের এবং বামদিকের মানুষেরা জাহান্নামের।”
দ্বিতীয় আকাশ:
সেখানে ছিলেন ইয়াহিয়া (আ) এবং ইসা (আ)। নবিজিকে (সা) বলা হলো, ইনি ইয়াহিয়া এবং ইনি ইসা। তাদের সালাম দিন।” নবিজি (সা) তাঁদের সালাম জানালে তাঁরা বললেন, “হে আমাদের অভিজাত ভাই! হে অভিজাত নবি! স্বাগতম!” তৃতীয় আকাশ। সেখানে ইউসুফ (আ) ছিলেন এবং একই কথোপকথন হলো। এখানকার প্রসঙ্গেই নবিজি (সা) সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেছেন, “আমি ইউসুফকে (আ) দেখেছি। দেখে মনে হয়েছিল যেন পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যের অর্ধেকই তাঁকে দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ আকাশ:
সেখানে ছিলেন ইদ্রিস (আ)। তিনি বললেন, “হে আমার অভিজাত ভাই। হে অভিজাত নবি। স্বাগতম!”
পঞ্চম আকাশ:
সেখানে ছিলেন হারুন (আ)। সেখানেও একই কথোপকথন হলো।
ষষ্ঠ আকাশ:
সেখানে মুসা (আ) ছিলেন এবং সেখানেও একই কথা হলো। নবিজি (সা) সেখানে গেলে মুসা (আ) কাঁদতে লাগলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কাঁদছেন কেন?” মুসা (আ) জবাবে বললেন, “আমি কাঁদছি কারণ আমার পরে প্রেরণ করা এই যুবক ব্যক্তিটির অনুসারীর সংখ্যা জান্নাতে আমার অনুসারীদের চেয়েও বড় হবে।”
[নোট ১: এখানে মুসা (আ) নবিজির (সা) প্রতি যে ঈর্ষা প্রকাশ করছেন তা ইতিবাচক ঈর্ষা। কারি, কোরানের হাফেজ, আলেম, উদার ধনী ব্যক্তিদের প্রতি আমরা এরকম ইতিবাচক ঈর্ষা করতে পারি]
(নোট ২: নবিজির (সা) বয়স তখন ছিল ৫১ বা ৫২ বছর। মুসা (আ) যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স ছিল ১৩০ বছরেরও বেশি। সুতরাং নবিজি (সা) তাঁর চোখে একজন যুবক।]
সপ্তম আকাশ:
নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি ইব্রাহিমকে (আ) দেখতে পেলাম। তিনি তাঁর পিঠ বায়তুল মামুরের দিকে হেলান দিয়ে বসেছিলেন।” জিব্রাইল (আ) পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “ইনি আপনার পিতা ইব্রাহিম (আ)। তাঁকে সালাম দিন।” নবিজি (সা) সালাম জানালে ইব্রাহিম (আ) জবাবে বললেন, “হে আমার অভিজাত পুত্র! হে অভিজাত নবি! স্বাগতম!”
[নোট: শুধু আদম (আ) ও ইব্রাহিমই (আ) নবিজিকে ‘পুত্র’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। বাকিরা তাঁকে ‘ভাই’ বলে ডেকেছিলেন।

নবিদের সাক্ষাৎ থেকে শিক্ষণীয়:
অন্য নবিদের সঙ্গে আমাদের নবিজির (সা) সাক্ষাৎ সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা আছে। তা হলো, সাক্ষাতের এই ক্রম নবিদের মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ধারণা অনুসারে কেউ কেউ বলেন, আদমের (আ) মর্যাদা সবচেয়ে কম। কিন্তু বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাব, সেটি ছিল মহানবিকে (সা) স্বাগত জানানোর জন্য এক বিশেষ আয়োজন, একটি অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কিছু বিখ্যাত ও সম্ভ্রান্ত নবিকে পাঠিয়েছিলেন মহানবি মুহাম্মদ (সা) ভেতরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। নবিজিকে (সা) এখানে মূলত রাজকীয় ‘লাল গালিচা’ সম্বৰ্ধনা জানানো হলো।
এই সাতটি আকাশে কোথায় কোন নবি থাকবেন তা নির্বাচনে অন্য এক তাৎপর্য আছে বলে প্রতীয়মান হয়:
১) আদম (আ) শুধুমাত্র নবিগণেরই নয়, তিনি সমগ্র মানবজাতির পিতা। তাই তিনিই যে সর্বপ্রথম নবিজিকে (সা) বরণ করে নেবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। আদম (আ) হলেন সেই ব্যক্তি যাঁকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জান্নাতে থাকার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। যদিও তাঁকে জান্নাত ছেড়ে যেতে হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আবার সেখানে ফিরে যাবেন। এর মধ্যে একটি প্রতীকী বিষয় রয়েছে: আদমকে (আ) যেমন পারলৌকিক/আধ্যাত্মিক জগতের সবচেয়ে পবিত্র স্থানটি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল, তেমনি নবিজিকেও (সা) অচিরেই এই পৃথিবীর পবিত্রতম স্থানটি (মক্কা) ছেড়ে যেতে হবে। তাঁকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করা হবে, যেমনটি পিতা আদমকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
২) ইসা (আ) ও ইয়াহিয়া (আ)। দ্বিতীয় অভ্যর্থনাকারী হিসেবে এই দুজন অবশ্যই উপযুক্ত, কারণ তাঁরা নবিজির (সা) সবচেয়ে কাছাকাছি। ইয়াহিয়া (আ) ও ইসার (আ) পরে সময়ের হিসেবে মুহাম্মদের (সা) আগে আর কোনো নবির আগমন ঘটেনি। নিজেদের সম্প্রদায়ের লোকেরাই তাঁদের উভয়কেই হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, এবং তাঁরা ইয়াহিয়াকে (জন দ্য ব্যাপটিস্ট) হত্যা করতে সফল হয়েছিল। নিউ টেস্টামেন্ট অনুসারে তারা বাইতুল মাকদিসে তাঁর মাথা কেটে ফেলেছিল। ইসাকেও (আ) তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা হত্যার চেষ্টা করেছিল। এখানে প্রতীকী ব্যাপারটি হলো: আল্লাহ নবি করিমকে (সা) বলছেন, তিনিই একমাত্র ব্যক্তি নন নিজেদের লোকেরা যার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল।
৩) ইউসুফ (আ)। তাঁর নিজের রক্ত-সম্পর্কের ভাইয়েরাই তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা অনুতপ্ত হয়ে তাঁর কাছে ফিরে আসেন। এখানে প্রতীকী ব্যাপারটি হলো: তোমার নিজের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় যাঁরা তোমাকে বহিষ্কার করেছেন, তাঁরা আবার ফিরে আসবেন এবং শেষ পর্যন্ত তোমার ধর্মমত গ্রহণ করে নেবেন। মক্কা বিজয়ের পর যখন কুরাইশরা কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে জিজেস করেছিল, “আপনি আমাদের ব্যাপারে কী করবেন?”, তখন ইউসুফকে (আ) উদ্ধৃত করে নবিজি (সা) বলেছিলেন, “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে (আমার) কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।” [সুরা ইউসুফ,
৪) ইদ্রিস (আ)। আমরা ইদ্রিস (আ) সম্পর্কে শুধু জানি যে, পবিত্র কোরানে আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আর আমি তাঁকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চমর্যাদায়।” [সুরা মরিয়ম, ১৯:৫৭] এটুকুই আমাদের জানা দরকার। আমাদের নবিজিকেও (সা) আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আর আমি তোমাকে উচ্চমর্যাদায় উন্নীত করেছি।” [সুরা ইনশিরাহ, ৯৪:৪)
৫) হারুন (আ)। হারুন (আ) ও মুসা (আ) উভয়ের ক্ষেত্রেও কারণ একই। প্রথমে তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলেও পরবর্তী সময়ে মেনে নিয়েছিল।
৬) মুসা (আ)। আমাদের নবিজির (সা) পর দ্বিতীয় বৃহত্তম উম্মত হবে মুসার (সা)। তাঁর সঙ্গেই আমাদের নবিজির (সা) অভিজ্ঞতার মিল সর্বাধিক। নবিদের মধ্যে তাঁর অভিজ্ঞতা এক কথায় অতুলনীয়। প্রকৃতপক্ষে মুসার (আ) অভিজ্ঞতার ভান্ডার আমাদের নবিজির (সা) অভিজ্ঞতার চেয়েও অনেক বেশি সমৃদ্ধ। বেশ কয়েকটি সহিহ হাদিস অনুসারে, নবিজি (সা) বলেছেন, “আসলেই মুসা (আ) আমার চেয়েও বেশি দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছিলেন। কিন্তু তিনি সব সময়ই ধৈর্যশীল ছিলেন।”
[মনে রাখবেন, নবিগণ যেখানে অবস্থান করছিলেন তা বিভিন্ন স্তরের আকাশ, জান্নাত নয়। সকল নবিই এক সময় জান্নাতের উচ্চ স্তরে থাকবেন। এই মুহূর্তে তাঁদেরকে তাঁদের স্থান থেকে আকাশে (সামাওয়াত) আনা হয়েছে নবি করিমকে (সা) স্বাগত জানানোর জন্য। তাঁরা হয়তো তাঁদের নিজ নিজ কবরে প্রার্থনারত অবস্থায় আছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ইসা (আ), যিনি নবিজির (সা) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নেমে এসেছিলেন। এটিও প্রতীকী। যেহেতু ইসা (আ) শেষ সময়ে আবার পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবেন। আদমের (আ) পর থেকে জান্নাতে আর কেউ বসবাস করেনি, বিচারের দিন পর্যন্ত আর কেউ করবেও না ।]
৭) ইব্রাহিম (আ)। এখানে নবি করিমকে (আ) নিজের পূর্বপুরুষকে দেখানো হচ্ছে যিনি অন্য সকল নবির মধ্যে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। [মুসাও (আ) অনেক উচ্চ মর্যাদার ছিলেন। তিনি ছিলেন ‘কলিমুল্লাহ’ (যাঁর সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন)। কিন্তু ইব্রাহিম (আ) আরও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন ‘খলিলুল্লাহ’ (আল্লাহ তায়ালার ঘনিষ্ঠ বন্ধু)। একটি হাদিসে আছে, নবিজি (সা) বলেছেন, “আল্লাহ আমাকে এবং ইব্রাহিমকে (আ) ‘খলিল’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।” কেবলমাত্র দুজন মানুষই মর্যাদার ওই স্তর পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।
ইব্রাহিম (আ) তাঁর পিঠ বায়তুল মামুরের দিকে হেলান দিয়ে বসে থাকাও একটা বিশেষ অর্থ বহন করে। আল্লাহ পবিত্র কোরানের সুরা তুরে বলেছেন, “শপথ বায়তুল মামুরের।” [৫২:৪] একটি হাদিস অনুসারে, নবিজি (সা) বলেছেন, “এটি কাবার অনুরূপ আরেকটি ঘর।” বায়তুল মামুর সম্পর্কিত এটিই একমাত্র ঘাঁটি হাদিস আছে। এর ভিন্ন ভিন্ন ভাষা প্রচলিত থাকলেও মূলত এটি একটিই হাদিস। অন্য এক ভাষা অনুসারে, “এটি আকাশের কাবা।” এটি পৃথিবীর কাবার ওপরে অবস্থিত। যদি এটি পড়ে যায় তবে তা পৃথিবীর কাবার ওপরেই পড়বে।
আল্লাহ বায়তুল মামুর সৃষ্টি করার পর থেকে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা সেখানে প্রবেশ করে তাওয়াফ ও নামাজ আদায় করছেন, তাঁরা কখনই আর বের হন না। প্রতিদিনই এমনটি ঘটে। সুবহানআল্লাহ! আমরা কখনোই ফেরেশতার সংখ্যা গণনা করতে পারব না। আল্লাহ ভালো জানেন। ইব্রাহিম (আ) সেই ব্যক্তি যিনি পৃথিবীতে কাবাঘর তৈরি করেছিলেন। সুতরাং আকাশের কাবার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা অবশ্যই যথাযথ ।
রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ – পর্ব ২

নবিদের সঙ্গে কথোপকথন
আগের পর্বে যেমনটি উল্লেখ করেছি, ইসরা ও মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, নানা ছোট ছোট ঘটনার কালানুক্রম অনুসারে সাজানো। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, নবি করিম (সা) অন্য নবি-রসুলদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। কিন্তু কোথায় তা ঘটেছে? আকাশের বিভিন্ন স্তরে হতে পারে, আবার বায়তুল মাকদিসেও হতে পারে।
নবিজির (সা) বরাত দিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন, “ইসরা ও ‘মিরাজের রাতে তিনি ইব্রাহিম (আ), মুসা (আ) এবং ইসার (আ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে শেষ বিচারের দিন সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করেন। প্রথমে ইব্রাহিমকে (আ) জিজ্ঞেস করা হলো, কেয়ামতের দিন সম্পর্কে বলুন।’ তিনি বললেন, ‘ওই দিনটি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’ তখন তাঁরা মুসাকে (আ) একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে তিনিও অনুরূপ জবাব দিলেন।
অতঃপর ইসাকে (আ) জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন: ‘আমাকে জানানো হয়েছে যে, আমার পৃথিবীতে ফিরে আসাটা হবে কেয়ামতের একটি নিদর্শন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানেন সেটা কবে হবে। তবে সেই সময় দাজ্জাল আসবে এবং আমি তাকে হত্যা করব। মানুষ তখন বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। প্রতিটি উপত্যকা থেকে ইয়াজুজ ও মাজুজ বেরিয়ে আসবে। তারা (ইয়াজুজ ও মাজুজ) সেসব এলাকা অতিক্রম করবে সেখানকার সব পানি পান করে নিঃশেষ করে ফেলবে, যতক্ষণ না আমি আল্লাহর কাছে তাদেরকে মেরে ফেলার জন্য দোয়া করব।
সুতরাং আল্লাহ তাদের মেরে ফেলবেন, এবং তাদের পচে যাওয়া দেহের দুর্গন্ধ পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। তখন আমি এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আবারও দোয়া করব। ফলে আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি প্রেরণ করবেন এবং বৃষ্টির পানিতে দেহগুলো ভেসে গিয়ে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিচারের দিনটি হবে একটি গর্ভবর্তী মহিলার মতো, যে তার সন্তান প্রসব করতে চলেছে।”
তিন নবির মধ্যে সংঘটিত এই কথোপকথনটি হাদিসের বইগুলোতে লিপিবন্ধ করা আছে। তবে তাঁরা অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলেছিলেন কি না তা আল্লাহই ভালো জানেন। ইসা (আ) যা বলেছিলেন তা পবিত্র কোরানেও উল্লেখ আছে। “যতক্ষণ না (কেয়ামতের নিদর্শন হিসেবে) ইয়াজুজ ও মাজুজকে ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চভূমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে।” [সুরা আম্বিয়া, ২১:৯৬) ইয়াজুজ ও মাজুজ, ইসার (আ) ফিরে আসা, বিচারের দিন ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে। ইসরা ও ‘মিরাজের এই ঘটনা থেকে ধরে নেওয়া যায়, ওই হাদিসগুলোর উৎস সরাসরি ইসা (আ)।
ইসরা ও’ মিরাজের আরেকটি কথোপকথন হাদিসের বইগুলোতে লিপিবদ্ধ আছে, যেখানে নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি ইসরার রাতে ইব্রাহিমের (আ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘হে মুহাম্মদ (সা)! তোমার উম্মতকে আমার সালাম দাও।” এখানে ইব্রাহিম (আ) তাঁর নিজের উত্তরপুরুষের মাধ্যমে আমাদের তাঁর সালাম জানাচ্ছেন।

ইসরা ও মিরাজ মালিক (জাহান্নামের দ্বাররক্ষী)
বর্ণিত আছে, নবি করিম (সা) জাহান্নামের-দ্বাররক্ষী মালিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই ঘটনা কোথায় ঘটেছিল তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, তবে বায়তুল মাকদিসে কিংবা ঊর্ধ্বলোকে আরোহণের সময় ঘটে থাকতে পারে। পবিত্র কোরানে তাঁর নামের (মালিক) উল্লেখ রয়েছে:
“তারা আর্তনাদ করে বলবে, ‘হে মালিক (জাহান্নামের-দ্বাররক্ষী)! তোমার প্রতিপালক আমাদের যেন শেষ করে দেন। সে বলবে, ‘নিশ্চয়ই তোমরা তো এভাবেই থাকবে।” [সুরা জুখরুফ, ৪৩:৭৭] জিব্রাইল (আ) নবিজিকে (সা) পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “হে মুহাম্মদ! ইনি মালিক, জাহান্নামের-দ্বাররক্ষী। তাঁকে সালাম দিন।” সুতরাং নবিজি (সা) অভিবাদন জানাতে ঘুরে দাঁড়ালেন। কিন্তু তিনি মুখে কিছু উচ্চারণ করার আগেই মালিকই তাঁকে প্রথম সালাম জানালেন। নবিজি (সা) তাঁকে সালামের জবাব দিলেন ।
নবিজি (সা) বর্ণনা করেছেন, মালিককে খুবই বিমর্ষ ও গম্ভীর দেখাচ্ছিল। তিনি জিব্রাইলকে (আ) এই বিমর্ষতার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। (নবিজির (সা) এই প্রশ্নটি থেকে ধারণা করা যায়, অন্য ফেরেশতাগণ সব সময় তাঁর কাছে খুশি মনে দেখা দিতেন। জিব্রাইল (আ) জবাবে বলেন, “তাঁকে সৃষ্টি করার পর থেকে তিনি কখনও হাসেননি (কিংবা তাঁকে স্মিত মুখে দেখা যায়নি)। তিনি যদি কারও ব্যাপারে খুশি হতেন, তবে তিনি হতেন আপনিই।”
আসলে জাহান্নাম পাহারা দিতে দিতে বিষণ্ণতা তাঁকে স্থায়ীভাবে পেয়ে বসেছে। যদিও নবিজি (সা) জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে গিয়েছিলেন, তিনি কিন্তু মালিকের সঙ্গে জাহান্নামের দ্বারে ‘কর্তব্যরত অবস্থায় দেখা করেননি। বরং তাঁকে সালাম জানাতে মালিককে তাঁর কাছে আনা হয়েছিল। মালিক একজন অভিজাত ফেরেশতা হলেও জাহান্নামের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার নবিজির (সা) সঙ্গে যে জাহান্নামের কোনো সম্পর্ক নেই তা প্রদর্শন করতেই হয়তো মালিকই প্রথমে তাঁকে সালাম জানিয়েছিলেন।

মিরাজ: সিদরাতুল মুনতাহা:
নবিজি (সা) অন্য নবিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সপ্তম আকাশ থেকে আরও ওপরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর কথায়, “তখন আমি আমার সামনে সিদরাতুল-মুনতাহা দেখতে পেলাম।” সিদরাতুল-মুনতাহা কী? আরবিতে ‘সিদরাহ’ বলতে বোঝায় বৃহৎ শাখাবিশিষ্ট বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে থাকা এক প্রকার প্রশস্ত গাছ, যা মরুভূমিতে জন্মায়। সুস্বাদু ফল ও মিষ্টি মাপের জন্য এই গাছ পরিচিত। আর ‘মুনতাহা’ শব্দটির অর্থ ‘একেবারে শেষ প্রান্ত’।
সুতরাং সিদরাতুল-মুনতাহা হলো ‘শেষ প্রান্তের গাছ’। নবিজি (সা) বলেছেন, “এই গাছের ফলগুলো ছিল হাজরের অধিবাসীদের ব্যবহৃত পানির পাত্রের মতোই বড়, এর পাতাগুলো ছিল হাতির কানের মতো।” লক্ষ করুন, নবিজি (সা) বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করতে এমন রূপক ব্যবহার করেছেন যাতে সাহাবিরা সহজেই বুঝতে পারে।
সহিহ বুখারির একটি হাদিসে আছে, নবিজি (সা) বলেছেন, “অতঃপর জিব্রাইল (আ) সিদরাতুল মুনতাহা পৌঁছানো পর্যন্ত আমার সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখে যেতে থাকলেন। এটি (সিদরাতুল মুনতাহা) এমন একটি রঙে আচ্ছাদিত ছিল, যা আমার অচেনা।” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজেই কোরানে বলেছেন: “তখন সিদরাহ গাছটা আচ্ছাদিত ছিল, যা দিয়ে আচ্ছাদিত থাকে।” [সুরা নজম, ৫৩:১৬] গাছটা কী দিয়ে আচ্ছাদিত ছিল তা আল্লাহ তায়ালা নির্দিষ্টভাবে বলেননি। এ
খানে লক্ষণীয়, আমাদের পরিচিত বর্ণালির বাইরে সেখানে আরও কিছু রং ছিল। নবিজি (সা) সেখানে এমন কিছু রং দেখতে পেয়েছেন, যা এই পৃথিবীতে দেখা যায় না। বিষয়টা বৈজ্ঞানিকভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। পৃথিবীতে আমরা রঙের যে বর্ণালি দেখতে পাই তা এখানকার আলোর উৎস থেকে যা কিছু সৃষ্টি। নবিজি (সা) যে রংগুলো দেখেছেন তা কেবল ভিন্ন ধরনের আলোর দ্বারা সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা যায়। সম্ভবত মিরাজের সময় নবিজি (সা) ভিন্ন এক জগতের ভিন্ন এক স্তরে বিরাজ করছিলেন। সহিহ বুখারি অনুসারে, নবি করিম (সা) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আরও ওপরে যাওয়ার আগে সিদরাতুল মুনতাহাই হলো তাঁর দেখা আল্লাহর শেষ সৃষ্টি।
সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বর্ণনা অনুসারে নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি সিদরাতুল মুনতাহার থামলাম, যা ষষ্ঠ আকাশে অবস্থিত। পৃথিবী থেকে ওপরে পাঠানো সবকিছুই (যেমন দোয়া, নামাজ, উত্তম আমল, ভালো কথা ইত্যাদি) সিদরাতুল মুনতাহাতে গিয়ে থেমে যায়। আবার এখান থেকেই পৃথিবীতে আগত সমস্ত কিছু (যেমন বৃষ্টি) উৎপন্ন হয় এবং নেমে আসে। নবিজির (সা) অভিজ্ঞতাকে আল্লাহ তায়ালা আরও বর্ণনা করেছেন, “তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি বা দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের অন্যতম নিদর্শনগুলো দেখেছিলেন।”
[সুরা নজম, ৫৩:১৭-১৮) নবিজি (সা) সিদরাতুল-মুনতাহা দেখার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ সৃষ্টি দেখতে পেয়েছিলেন। তাবারির বর্ণনা করা একটি হাদিস অনুসারে ধারণা করা যায়, সিদরাতুল-মুনতাহা আসলে স্থির নয়, বরং আমাদের এই দৃশ্যময় জগতের বাইরে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল জাঁকজমকপূর্ণ প্রকাণ্ড একটি বৃক্ষ।
কালানুক্রম সংক্রান্ত আরেকটি আপাত অসঙ্গতি লক্ষ করুন। সহিহ বুখারির হাদিস অনুসারে নবিজি (সা) ইব্রাহিমকে (আ) সপ্তম আকাশে অতিক্রম করেন, তারপর তিনি সিদরাতুল-মুনতাহা দেখতে পান। আবার সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুসারে, তিনি ষষ্ঠ আকাশে সিদরাতুল-মুনতাহা দেখেন। এখানে আমরা স্পষ্ট একটি অসঙ্গতি দেখতে পাচ্ছি। ইমাম আল-নওয়াবি এই বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, পাছের কাণ্ডটি ষষ্ঠ আকাশে শুরু হয়েছে, শাখাগুলো সপ্তম আকাশের শেষের দিকে গিয়ে শেষ হয়েছে, যেহেতু অবস্থানের নিরিখে সিদরাতুল-মুনতাহাই আল্লাহ তায়ালার শেষ সৃষ্টি। এর বাইরে ও তাঁর আরশ ছাড়া আর কিছু নেই। বিশিষ্ট তাবেয়িন (ইবনে আব্বাসের ছাত্র) বলেছেন, “সিরাহ সপ্তম আকাশে শেষ হয়েছে।” এর অর্থ হলো, এটি নিশ্চয়ই অন্য কোথাও শুরু হয়েছে। এ থেকে আরও প্রতীয়মান হয় যে, সিদরাহ একটি বিশাল বৃক্ষ।
মিরাজ: চারটি
নদী তারপর নবিজি (সা) বললেন, “সিদরাতুল মুনতাহার পাদদেশে চারটি নদী নেমে এসেছে। এর মধ্যে দুটি লুকানো, বাকি দুটি দৃশ্যমান। আমি জিব্রাইলকে (আ) বললাম, ‘এই নদীগুলো কী?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘লুকানো নদীগুলো শুধু জান্নাতেই আছে (অর্থাৎ আপনি এগুলো পৃথিবীতে দেখতে পাবেন না)। পৃথিবীতে যে দুটো নদী দেখা যায় সেগুলো হলো, নীল (নাইল)’ এবং ফোরাত (ইউফ্রেটিস)।”
এখানে নবিজি (সা) এমন একটি কথা বলেছেন যার গভীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। এখন আমরা জানি, সভ্যতার পরিক্রমায় এই দুটি নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন সভ্যতা মেসোপটেমিয়া (উর, ব্যাবিলন ইত্যাদি), যা মূলত ফোরাত নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় সভ্যতাটি গড়ে উঠেছিল নীল নদের অববাহিকায়। অনাদিকাল থেকেই এই দুটি নদী জীবন ও সভ্যতার নিত্যসঙ্গী হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। জিব্রাইলের (আ) ভাষ্যে উভয় নদীই আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্ত ।
অন্যদিকে, জান্নাতের দুটি নদী (যা লুকানো আছে) হলো, আল-কাওসার ও সালসাবিল। এই দুটি নদীর কথা পবিত্র কোরানেও উল্লেখ আছে “নিঃসন্দেহে আমি তোমাকে কাউসার (ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের প্রাচুর্য দান করেছি।” [সুরা কাওসার, ১০৮:১] “সেখানে থাকবে সালসাবিল নামক এক নহর (ঝরনা/নদী)।” [সুরা দাহ, ৭৬:১৮)

মিরাজ: বায়তুল মামুর
মিরাজ সম্পর্কিত একটি বর্ণনা অনুসারে, নবি করিম (সা) বলেছেন, “তখন আমি বায়তুল মামুরকে দেখেছি।” অন্য একটি বর্ণনায় তিনি বলেছেন, “আমি ইব্রাহিমকে (আ) সপ্তম আকাশে দেখতে পেয়েছি, তিনি বায়তুল মামুরের পেছনে পিঠে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন।”
এই দুটি বর্ণনার ঘটনা একই সময়ে ঘটেছিল, নাকি নবিজি (সা) দুটি পৃথক সময়ে বায়তুল ‘মামুরকে দেখেছিলেন তা আমরা সঠিকভাবে জানি না। সাধারণভাবে সিরাহের ক্ষেত্রে, এবং বিশেষভাবে ইসরা ও মিরাজের ক্ষেত্রে, এরকম অনেকবার ঘটেছে। মানবিক সীমাবদ্ধতার কারণেই সাহাবিদের বর্ণনায় কিছুটা তারতম্য খুবই স্বাভাবিক। আমাদের মেনে নিতে হবে, সবার হুবহু একই রকম হওয়া সম্ভব নয়।
যেমনটি আমরা আগে উল্লেখ করেছি, নবিজি (সা) বলেছেন, “বায়তুল ‘মামুর কাবার অনুরূপ একটি ঘর।” আবার অন্য একটি হাদিসে আছে, এটি কাবার ঠিক ওপর বরাবর অবস্থিত; অর্থাৎ যদি তা নিচে পড়ে যায়, তাহলে পৃথিবীতে কাবার ওপরে পড়বে। তিনি আরও বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বায়তুল মামুর সৃষ্টি করার পর থেকে সেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার প্রবেশ করেন, আর কখনো বেরিয়ে আসেন না। এখন যদি আপনি অঙ্ক কষতে বসেন সেখানে ফেরেশতা আছেন, তাহলে আপনার মাথা খারাপ হওয়ার দশা হবে। আল্লাহ কোরানে বলেছেন, শুধু তিনিই জানেন কতজন সৈন্য (ফেরেশতা) আছে [৭৪:৩১)।
মিরাজ: আসল অবয়বে জিব্রাইল (আ) তারপর নবি করিম (সা) বলেছেন, তিনি ফেরেশতা জিব্রাইলকে (আ) তাঁর আসল অবয়বে দেখতে পেয়েছিলেন, যা তিনি অনেক হাদিসে বর্ণনা করেছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, “জিব্রাইলের (আ) ৬০০ ডানা ছিল। তিনি পুরো দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত ছিলেন।” তাবারির একটি হাদিসে আছে, “জিব্রাইলের (আ) ডানার পালক থেকে মুক্তো ও প্রবাল ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে পড়ছিল।” সুতরাং বলা যায়, সিদরাতুল মুনতাহার মতো জিব্রাইলও (আ) কোনো স্থির সৃষ্টি নন।
এখানে উল্লেখ্য, একজন ফেরেশতার সর্বোচ্চ ৬০০ ডানা থাকতে পারে, যা জিব্রাইলের (আ) ছিল, কারণ তিনি ছিলেন ফেরেশতাদের মধ্যে সেরা। তবে বেশির ভাগ ফেরেশতার ডানার সংখ্যা দুই, তিন কিংবা চার। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানের সুরা কাতিরে [৩৫১] উল্লেখ করেছেন।
মিরাজ: আল্লাহর প্রধান নিদর্শনসমূহ
ইবনে মাসউদ বলেছেন, নবিজির (সা) জিব্রাইলকে (আ) দেখার বিষয়টি কোরানে উল্লিখিত আছে। “তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের অন্যতম নিদর্শনগুলো দেখেছিলেন।” [সুরা নজম, ৫৩:১৮] এই প্রধান নিদর্শনগুলো বলতে আমরা নিচের তিনটি জিনিস বুঝতে পারি।
১। সিদরাতুল মুনতাহা,
২। বায়তুল ‘মামুর,
৩। জিব্রাইলের (আ) আসল অবয়ব।
সিদরাতুল মুনতাহা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে ওপরের স্তরে অবস্থিত বস্তু বা স্থান। বায়তুল ‘মামুর আকাশে অবস্থিত আধ্যাত্মিক কাবা, যেখানে অসংখ্য ফেরেশতা প্রতিনিয়ত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল। অন্যদিকে জিব্রাইল (আ) ফেরেশতাদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার কাছে সর্বাপেক্ষা পছন্দের। এখানে আদম সন্তানদের (মানুষদের) মধ্যে সর্বাপেক্ষা পছন্দের ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা পছন্দের ফেরেশতাকে আসল অবয়বে দেখতে পাচ্ছেন। বর্ণিত আছে, নবি করিম (সা) জিব্রাইলকে (আ) তাঁর আসল অবয়বে এইবারসহ মোট দুবার মাত্র দেখেছিলেন।

মিরাজ: আল্লাহ তায়ালা নবিজিকে (সা) যে তিনটি জিনিস দিয়েছিলেন:
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, ইবনে মাসউদ বলেছেন যে, নবিজি (সা) আকাশে সিদরাতুল মুনতাহাতে থামেন। তারপর সেখানে তাঁকে তিনটি জিনিস দেওয়া হয়।
১) দৈনিক পাঁচবার নামাজ পরে আলোচনা করা হবে),
২) সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত,
৩) আল্লাহর প্রতিশ্রুতি (আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ): নবিজির (সা) উম্মতদের মধ্যে থেকে যে ব্যক্তি শিরক ছাড়া আল্লাহর ইবাদত করবেন, তাঁকে ক্ষমা করা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।
সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত [২:২৮৫-২৮৬] পবিত্র কোরানে একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। কোরানের বাকি সব অংশই জিব্রাইল (আ) নবিজির (সা) কাছে গিয়ে তেলাওয়াত করেছেন। কেবল এই একটি স্তবত (সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত) মহান আল্লাহ তায়ালা সরাসরি নবিজিকে (সা) তেলাওয়াত করে শুনিয়েছেন। অর্থাৎ এই দুটি আয়াত পৃথিবীতে ওহি আকারে নাজিল করার বদলে তা গ্রহণ করার জন্য বরং নবিজিকেই (সা) ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যা-ই হোক, এটি একটি মত মাত্র। আমরা এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানি না। আরেকটি হাদিসে আছে, নবি করিম (সা) বলেছেন, “আমাকে আল্লাহর আরশের নিচের ভান্ডার থেকে এই দুটি আয়াত দেওয়া হয়েছে।” সুতরাং ইবনে মাসউদের বক্তব্যের (অর্থাৎ ষষ্ঠ আকাশে তা দেওয়া হয়েছিল) সঙ্গেও এর মিল আছে।
আমরা এই দুটি আয়াতের অনেক ফজিলত সম্পর্কে জানি:
নবি করিম (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি এই দুটি আয়াত তেলাওয়াত করবে, আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন। অন্য একটি হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে এই আয়াতগুলো তেলাওয়াত করবে, তার জন্য এটাই ‘যথেষ্ট হবে। এখানে যথেষ্ট শব্দের অর্থ সম্পর্কে বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা রয়েছে। একজন পণ্ডিত বলেছেন, এটি আপনাকে শয়তান থেকে রক্ষা করবে; অন্য কিছু পণ্ডিত বলছেন, আপনি তাহাজ্জুদ নামাজ না পড়লেও আল্লাহ আপনাকে গাফেলদের (অবহেলাকারী) দলে ফেলবেন না। সুতরাং আমাদের এই দুটি আয়াত মুখস্থ করা এবং প্রতি রাতে নিয়মিতভাবে পড়ার অভ্যাস করা উচিত।

মিরাজ: আল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ
তারপর নবি করিম (সা) মিরাজে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সাক্ষাতের বর্ণনা দেন। অনেক ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ, বিবরণী, গবেষণামূলক প্রবন্ধ ইত্যাদি পর্যালোচনা করেও আমরা এই সাক্ষাতের কোনো “বিস্তারিত বিবরণ খুঁজে পাই না, যা আসনটিক হিসেবে গ্রহণ করতে পারি এই সাক্ষাৎ নিয়ে অনেক বানোয়াট গল্প ও মনগড়া কাহিনি প্রচলিত আছে। বানোয়াট বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘তাশাহহুদ (আত্তাহিয়াতু লিল্লাহি), যা এই সাক্ষাতের সময়ে সংঘটিত কথোপকথনের সংক্ষিপ্তসার বলে বহুলভাবে প্রচলিত।
নবিজি (সা) কি একাই সিদরাতুল মুনতাহা পার হয়ে গিয়েছিলেন? নাকি ফেরেশতা জিব্রাইল (আ) তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন? এ বিষয়ে সহিহ বুখারিতে শুধু একটি রেফারেন্স পরোক্ষভাবে এসেছে। তা হলো, নবিজি (সা) বলেছেন, “তখন আমি আরও ঊর্ধ্বে আরোহণ করলাম।” এখানে ‘আমি একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে, জিব্রাইলের (আ) উল্লেখ নেই। এর (সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছানোর) আগের সব বর্ণনায় এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: “জিব্রাইল (আ) আমার সঙ্গে যেতে থাকেন।” আল্লাহ ভালো জানেন। তবে আমরা নবিজির (সা) এই কথা থেকে অনুমান করতে পারি যে তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পার হয়ে একাই এগিয়ে গিয়েছিলেন।
তারপর তিনি বলেছেন, “আমি এমন একটি স্তরে উঠেছিলাম যেখানে কলম দিয়ে লেখার শব্দ শুনতে পেয়েছি।” এখানে কলমের বিষয়টি কী? আর লিখছেই বা কে? আমরা অন্য এক হাদিস অনুসারে জানি, নবিজি (সা) বলেছেন, “আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন। তারপর তিনি কলমকে বললেন, ‘লেখো।’ কলম জিজ্ঞেস করল, “কী লিখব?’ আল্লাহ বললেন, ‘কেয়ামতের দিন অবধি যা যা ঘটবে তা লেখো।” সুতরাং বলা যেতে পারে, আল্লাহর সৃষ্ট কলম একা একাই লিখছে।
শুধু ৫০ বার নামাজের বিষয় ছাড়া ওই আল্লাহর সঙ্গে নবিজির (সা) ব্যক্তিগত সাক্ষাতে আর কী কী ঘটেছিল তা সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো বিবরণ নেই, যদিও আমরা অনুমান করতে পারি, আল্লাহর সঙ্গে নবিজির (সা) আরও কিছু কথা হয়েছিল। আমরা শুধু ৫০ বার নামাজের বিষয়টি সম্পর্কেই জানি। আমরা যে আর বেশি কিছু জানি না, এ বিষয়ে সম্ভবত আল্লাহ তায়ালার কোনো প্রজ্ঞা আছে। হয়তো সেখানে যা ঘটেছিল তা একান্তই নবিজির (সা) ব্যক্তিগত। হয়তো নবিজি (সা) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে এমন কিছু পেয়েছিলেন যা তিনি আমাদের বলতে চাননি, অথবা যা আমাদের জানার প্রয়োজন নেই। সম্পূর্ণ আলাপচারিতা সম্পর্কে শুধু আল্লাহ ও তাঁর রসুলই (সা) জানেন।

মিরাজ: ৫০ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ
আমরা শুধু যে বিষয়টি জানি তা হলো, আল্লাহ তায়ালা শুরুতে নবিজিকে (সা) প্রতিদিন ৫০ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নবিজি (সা) ওই নির্দেশ পেয়ে ফিরে আসার পথে মুসার (আ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন: মুসা নবিজিকে (সা) আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে আরও কম বার নামাজের অনুমতি চাইতে বলেন। নবিজি (সা) মুসার (আ) কাছে পৌঁছানোর আগে নিশ্চয়ই ইব্রাহিমকে (আ) অতিক্রম করেছিলেন। এ বিষয়ে ইব্রাহিম (আ) কিছু বলেননি। না বলার কারণগুলো হতে পারে এরকম:
১) ইব্রাহিম (আ) নবিগণের মধ্যে উচ্চতম স্তরের। অনুমান করা যায়, আল্লাহর আদেশ সম্পর্কে প্রশ্ন করা তাঁর স্বভাবের মধ্যে নেই। মুসা (আ) সেই স্তবের না হওয়ায় এ বিষয়ে দরকষাকষির সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন।
২) ইব্রাহিমের (আ) বড় আকারের উম্মাহ ছিল না। এ বিষয়ে নবিদের মধ্যে মুসা (আ) তখন পর্যন্ত ছিলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ। তখন মুহাম্মদের (সা) নবুয়তের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ১১-১২ বছরের। অন্যদিকে মুসার (আ) বনি ইসরায়েলের সঙ্গে কমপক্ষে ৮০-৯০ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল।
৩) মুসা (আ) ধারণা করেছিলেন, আল্লাহর সঙ্গে মুহাম্মদের (সা) সাক্ষাতের সময় কিছু একটা ঘটতে চলেছে। কীভাবে ধারণা করেছিলেন? কারণ, সংক্ষিপ্ত হলেও আল্লাহর সঙ্গে তাঁরও সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। মুসাই (আ) ছিলেন। একমাত্র নবি যিনি পৃথিবীতে আল্লাহ আজ্জা ওয়াজালের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। সুতরাং মুসাকে (আ) যেমন দশটি আদেশ” প্রদান করা হয়েছিল, তেমনি তিনি জানতেন যে, তাঁর উত্তরসূরি নবি মুহাম্মদকেও (সা) এই সাক্ষাতের সময় কিছু দেওয়া হবে।
মুসা (আ) নবিজিকে (সা) জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার প্রতিপালক তোমার উম্মতের জন্য তোমাকে কী বলেছেন?” নবিজি (সা) জবাবে বললেন, “তিনি বলেছেন, আমি যেন আমার উম্মতকে দিনে ৫০ ওয়াক্ত (বার) নামাজ পড়তে বলি।” এ কথা শুনে মুসা (আ) বললেন, “তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাও, তাঁকে এই সংখ্যা কমিয়ে দিতে বলো। বনি ইসরাইলের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, তোমার উম্মত এই আদেশ পালন করতে সক্ষম হবে না।”
মুসনাদ ইমাম আহমাদে বর্ণিত আছে (যদিও এই হাদিসটি অতটা প্রচলিত নয়), নবিজি (সা) তখন জিব্রাইলের (আ) দিকে তাকালে তিনি মুসার (সা) পরামর্শের প্রতি মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করেন। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসার (আ) মতো একজন নবির পরামর্শ সত্ত্বেও নবিজি (সা) দ্বিতীয় একটি মত গ্রহণ করেন। সুতরাং একজন সম্ভ্রান্ত নবির পরামর্শের প্রতি সর্বোত্তম ফেরেশতার সমর্থন পেয়ে নবিজি (সা) আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন।
এর পরের পর্যায়ের বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, নবিজি (সা) কমপক্ষে পাঁচবার ওপরে আল্লাহর কাছে ও নিচে মুসার (আ) কাছে ফিরে আসেন। প্রতিবারই মুসা (আ) তাকে একই কথা বলেন, “তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাও এবং তাঁকে নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা আরও কমানোর জন্য অনুরোধ করো। কারণ আমি বনি ইসরাইলকে দিয়ে চেষ্টা করেছি, তারা তা করতে সক্ষম হয়নি। তোমার উম্মতও তা করতে সক্ষম হবে না।” কারও মতে, নবিজির (সা) আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ায় প্রতিবারে ৫ ওয়াক করে, আবার কারও মতে প্রতিবারে ১০ ওয়াক্ত করে নামাজের সংখ্যা কমানো হয়েছিল।
অবশেষে যখন নবিজি (সা) দৈনিক মাত্র ৫ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে আল্লাহর দরবার থেকে ফিরে এলেন, তখন মুসা (আ) তাঁকে নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা আরও কমানোর জন্য আবার যেতে বললেন। এবার নবিজি (সা) বললেন, আমি অনেকবার গিয়েছি, আবার যেতে সত্যিই বিব্রত বোধ করছি। তবে আমি এখন সন্তুষ্ট ও খুশি।” নবিজি (সা) এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটি কন্ঠস্বর শোনা গেল, “আমার ফরজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং আমি আমার বান্দাদের জন্য (ইবাদতের) বিষয়টি সহজ করে দিয়েছি। পাঁচবার হলেও বান্দাকে পঞ্চাশবারের জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে।”
এ থেকে বোঝা যায়, দৈনিক নামাজের সংখ্যা যে পাঁচ হবে তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি আগেই জানতেন, নবিজি (সা) তাঁর কাছে নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ নিয়ে বারবার ফিরে আসবেন। সুতরাং নবিজি (সা) কখন থামবেন সে ‘ইলহাম’ আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দিয়েছিলেন (অর্থাৎ তাঁর মনে সঞ্চারিত করেছিলেন)। এ কারণেই নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা পাঁচে নামিয়ে আনার পর নবিজি (সা) আর যেতে চাননি ।
এই ঘটনা থেকে আমরা কয়েকটি বিষয়ে সম্যক ধারণা পেতে পারি:
১) এই ঘটনা থেকে আমরা নামাজের মর্যাদা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাই। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নবিজির (সা) এই ব্যক্তিগত সাক্ষাতের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মুসলিমদের জন্য নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। অন্য সব নির্দেশ আল্লাহ জিব্রাইলের (আ) মাধ্যমে নবিজির (সা) কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু নামাজ প্রতিষ্ঠার এই নির্দেশ এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর বিশেষ বার্তা সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার জন্য রসুলকে (সা) ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য যদি একটি নেয়ামতের কথাও উল্লেখ করতে হয়, তাহলে নামাজের কথাই বলতে হবে। নামাজের গুরুত্ব পবিত্র কোরানের বেশ কয়েকটি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: ২:৩), (২০:১৪), (১১:১১৪), (১৯:৩১ ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু হাদিসও রয়েছে। প্রত্যেক নবির জন্যও নামাজ নির্ধারিত ছিল; এ থেকে নামাজের গুরুত্ব সম্যকভাবে উপলব্ধি করা যায়।
২) আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথমে প্রতিদিন ৫০ বার নামাজ পড়ার বিধান এসেছিল বলে (যদিও পরে তা কমিয়ে পাঁচবার করা হয়েছে) নবিজি (সা) নিজের জন্য ৫০ রাকাত নামাজ পড়া নির্দিষ্ট করে নিয়েছিলেন। ৫০ রাকাতের হিসাবটা এরকম:
ফরজ : ১৭ রাকাত
সুনান আল-রাতিবা :১২ রাকাত
তাহাজ্জুদের আগে : ২ রাকাত
তাহাজ্জুদের জন্য : ৮ রাকাত
বিতর : ৩ রাকাত
সালাত আল-দুহা : ৮ রাকাত
————————————————————-
মোট : ৫০ রাকাত
: ৫০ রাকাত
নবি করিমের (সা) জন্য এই ৫০ রাকাত নামাজ ছিল তাঁর নিয়মিত রুটিনের অংশ, যদিও তা উম্মতের জন্য ওয়াজিব নয়। অবশ্য তাহিয়াতুল মসজিদ, ইস্তিখারাহ ইত্যাদি নামাজ এই হিসাবের অন্তর্ভূক্ত নয়।

মিরাজ: নামাজের সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে ক্রমশ পাচে নামিয়ে আনার পেছনের প্রজ্ঞা:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যখন জানতেনই যে নামাজের সংখ্যা নামিয়ে আনা হবে, তখন এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে তাঁর কী প্রজ্ঞা রয়েছে? কেনই বা ৫০ থেকে ৪৫ এভাবে ১০ থেকে ৫ পর্যন্ত নামিয়ে আনা হলো? আমরা এর কয়েকটি কারণ অনুমান করতে পারি:
প্রথমত, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার করুণা ও মহিমা প্রদর্শন করা। তিনি আমাদের জন্য জীবনকে কঠিন করতে চান না। তিনি আমাদের সবকিছু সহজ করতে চান। পবিত্র কোরানেও এ বিষয়টি বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ: 14:28] [2:185], [22:7৮] ইত্যাদি ।
দ্বিতীয়ত, এখানে আমরা দেখতে পেলাম, নবি করিম (সা) আল্লাহ তায়ালাকে কোনো অনুরোধ করলে তিনি (আল্লাহ) তা শোনেন। তৃতীয়ত, আল্লাহ তায়ালা একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছেন: “হে আদম সন্তান! তোমাকে শুধু আল্লাহর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।” যদি প্রতিদিন ৫০ বার নামাজ পড়তে হতো, তাহলে আমাদের আক্ষরিক অর্থেই সারাদিন নামাজের মধ্যে থাকতে হতো। আল্লাহ এখানে ইঙ্গিতে বোঝাতে চাচ্ছেন, “তোমাদের উচিত ছিল প্রতিদিন ৫০ বার নামাজ পড়া। তবে তোমরা যে তা করতে পারবে না, তা আমি জানি। সুতরাং তোমরা যা খুশি তা করতে পার, তবে দিনে অন্তত ৫ বার নামাজ পড়বে।”
হৃদয় তা অস্বীকার করেনি (নোট: আল্লাহ তাঁর হৃদয়ে তা আরোপ করেছিলেন কারণ নবিজির (সা) দৃষ্টি এতে আবদ্ধ ছিল, এবং যখন তিনি কথা বলছেন, সত্য বলছেন)। তিনি যা দেখেছেন তোমরা কি সে সম্বন্ধে বিতর্ক করবে? নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন, শেষ সীমান্তে অবস্থিত সিদরা পাছের নিকটে, যার কাছেই ছিল জান্নাতুল মাওয়া (আশ্রয় উদ্যান)। তখন সিদরাহ গাছটা আচ্ছাদিত ছিল যা দিয়ে আচ্ছাদিত থাকে। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি বা দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের অন্যতম দেখেছিলেন।” [৫৩:১১-১৮]
রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ- পর্ব ৩

ফেরাউনের কন্যার মাশিতাহর কাহিনি:
মুসনাদ ইমাম আহমেদ বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিস অনুসারে, নবি করিম (সা) বলেছেন, “ইসরা ও মিরাজের রাতে আমি খুব মিষ্টি একটা গন্ধ পেয়ে জিব্রাইলকে (আ) জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই সুন্দর গন্ধটা কীসের? জিব্রাইল (আ) জবাবে বললেন, ‘এই সুগন্ধ ফেরাউনের কন্যার ‘মাণিতাহ’র (অর্থাৎ যে চুল আঁচড়িয়ে দেয়) এবং তার (মাণিতাহর) সন্তানদের। এবার আমি জিব্রাইলের (আ) কাছে জানতে চাইলাম, “তাঁদের কাহিনিটি কী?’ জিব্রাইল (আ) তখন কাহিনিটি বললেন:
ফেরাউনের মেয়ের চুল আঁচড়ে দিচ্ছিলেন তাঁর কেশ পরিচর্যাকারিণী (মাশিতাহ)। হঠাৎ তাঁর হাত থেকে চিরুনি পড়ে গেলে তিনি ‘বিসমিল্লাহ” বলে ওঠেন। তা শুনতে পেয়ে ফেরাউনের মেয়ে বলল, “নিশ্চয়ই তুমি আমার পিতার নাম বোঝাতে চেয়েছ?’ মাশিতাহ বললেন, ‘না; আমার, আপনার এবং আপনার পিতার প্রতিপালক আল্লাহকে বোঝাতে চেয়েছি।’ ফেরাউনের মেয়ে বলল, ‘তুমি কি চাও যে তুমি আমাকে যা বললে, আমি তা আমার পিতাকে বলে দিই?’ মাশিতাই বললেন, “বলতে পারেন।’
ফেরাউন মেয়ের কাছে ঘটনা জানার পর মাশিতাহকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি বলছ যে আমি ছাড়াও তোমার অন্য কোনো প্রতিপালক আছে?’ (দেখুন কোরান (৭৯:২৪] [২৮:৩৮ ) মাশিতাই সাহসের সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমার এবং আপনার প্রতিপালক আল্লাহ।’ এ কথা শোনার পর ফেরাউন একটি ফুটন্ত গরম কড়াই এনে মাণিতাহ ও তাঁর সন্তানদের কতজন তা সঠিকভাবে জানা যায়নি) বলল, তাঁরা হয় ফেরাউনকে তাঁদের প্রতিপালক হিসেবে স্বীকার করে নেবেন, নতুবা তাঁদেরকে ওই ফুটন্ত কড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
এই অবস্থায় মাশিতাই ফেরাউনকে শর্ত দিলেন। তাঁকে ও তাঁর সন্তানদের একসঙ্গে সমাহিত করতে হবে। ফেরাউন এই শর্তে রাজি হওয়ার পর মাণিতাহর সব সন্তানকে একে একে ফুটন্ত কড়াইয়ে নিক্ষেপ করা শুরু হলো তাঁর শেষ সন্তানটি ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশু, সে তখনো মায়ের বুকের দুধ পান করত। মাণিতাহ এই দুধের বাচ্চাটিকে নিয়ে একটু দ্বিধায় পড়ে গেলেন। শিশুটি অলৌকিকভাবে কথা বলে উঠল, ‘হে আমার মা! আপনি আমাকে নিয়ে কড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন, কারণ এই পৃথিবীর শান্তি পরের পৃথিবীর শান্তির তুলনায় কিছুই নয়। (অন্য বর্ণনায় আছে, শিশুটি বলেছিল, “দ্বিধাগ্রস্ত হবেন না, কারণ আপনি সত্যের পথে রয়েছেন’)।
তারপর মাশিতাহ (শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে) ফুটন্ত কড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ফেরাউনের মেয়ের ওই কেশ পরিচর্যাকারিণীর নামটি আমরা জানি না। নবিজি (সা) তাঁর উম্মতের নিকট তাঁর শক্ত ইমান, অনুকরণীয় ত্যাগ এবং অপরিসীম সাহসের বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ এই কাহিনিটি সংরক্ষণ করতে চেয়েছেন যাতে মুসলিমরা তাঁকে একজন অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এই কাহিনিটি ওল্ড টেস্টামেন্ট বা ইহুদি ধর্মগ্রন্থে নেই। ঘটনাটি মুসার (আ) উম্মতের ক্ষেত্রে ঘটলেও এর কাহিনি আমাদের উম্মতের মাধ্যমে সংরক্ষিত আছে।

জান্নাত পরিদর্শন
এর আগের পর্বে যেমনটি উল্লেখ করেছি, নবি করিম (সা) আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সাক্ষাতের পর অন্য জিনিসগুলো দর্শন করেন। প্রথমেই তিনি গেলেন জান্নাত-পরিদর্শনে। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুসারে, সেখানে তিনি দেখতে পেলেন, তাঁবুগুলো মুক্তো দিয়ে তৈরি এবং মাটি কস্তুরি (সুগন্ধী) দিয়ে তৈরি।
এখানে একটি ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন চলে আসে। কিছু পণ্ডিতের মত অনুসারে, “আদমের (আ) সময় থেকে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করেনি।” এই বক্তব্য সমর্থন করার জন্য হাদিসও আছে, যেখানে বলা হয়েছে, শেষ বিচারের দিনের পর জান্নাতে প্রবেশকারী প্রথম ব্যক্তি হবেন মহানবি মুহাম্মদ (সা)। এখানে আরও একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিধিঃ যিনি একবার জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তিনি আর কখনোই সেখান থেকে বেরিয়ে আসবেন না।
তাহলে আমরা এই বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করব? এক্ষেত্রে নিচের দুটো ব্যাখ্যা বিবেচনা করা যেতে পারে:
প্রথম ব্যাখ্যাঃ আদমের (আ) পর অবশ্যই আমাদের নবিজিই (সা) হবেন। জান্নাতে প্রবেশকারী প্রথম ব্যক্তি; তবে ইসরা ও মিরাজের সময়ে জান্নাতে প্রবেশের বিষয়টি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখতে হবে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: নবিজি (সা) জান্নাতে প্রবেশ করেননি। তিনি কেবল পরিদর্শন করেছেন, কিংবা শহিদদের মতো বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
[প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হয়, শহিদরা জান্নাতে বাস করছেন না, তাঁরা আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে জান্নাত দেখছেন। তাঁরা আছেন আত্মিক অবস্থায়, শারীরিক অবস্থায় নয় । নবিজির (সা) জান্নাত-পরিদর্শন সম্পর্কে আমরা এটুকুই জানি।

জাহান্নাম পরিদর্শন:
নবি করিম (সা) আরও বলেছেন, তিনি জাহান্নামের অনেক শাস্তি প্রত্যক্ষ করেছেন। এ থেকে ধারণা করা যায়, তিনি হয়তো সত্যিকার অর্থেই জান্নাতে প্রবেশ করেননি; কারণ তিনি স্পষ্টতই জাহান্নামে প্রবেশ করেননি। তিনি সম্ভবত জান্নাত বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করে বর্ণনা দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে জাহান্নামেরও বর্ণনা দিয়েছেন।
ইসরা ও মিরাজের রাতে নবিজির (সা) দেখা জাহান্নামের শাস্তি সম্পর্কে বহু হাদিস রয়েছে। প্রতিটি হাদিসেই আছে, তিনি শান্তি দেখে জিব্রাইলকে (আ) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এই লোকগুলো কারা?” একটি হাদিস অনুসারে, নবি করিম (সা) বলেছেন, জাহান্নাম পরিদর্শনকালে তিনি এমন মানুষদের শাস্তি দেখেছেন যারা এতিমের টাকা চুরি করত। তাদের নাক ছিল উটের মতো। তারা আগুনে তৈরি কয়লা খাচ্ছিল। তারা মুখ দিয়ে গরম কয়লা গ্রাস করছিল যা তাদের মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে আসছিল। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানেও বলেছেন, “যারা এতিমদের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা যেন আগুন দিয়েই নিজেদের পেট ভর্তি করে, অচিরেই এ লোকগুলো জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে থাকবে।” [সুরা নিসা, ৪:10 |
অন্য একটি হাদিস অনুসারে, নবিজি (সা) সেখানে তামার নখওয়ালা মানুষদের দেখতে পান, যারা নিজেদের শরীর ও মুখমণ্ডলে আঁচড় দিচ্ছিল, কারণ পৃথিবীতে তারা গিবত করত। নবিজি (সা) বলেছেন, তিনি এমন কিছু লোককে সেখানে দেখেছেন যাদের সামনে ভালো ও পচা, উভয় ধরনের মাংস রাখা ছিল। কিন্তু তারা ভালো মাংস না খেয়ে পচা মাংস খাচ্ছিল। তাদের সম্পর্কে জিব্রাইল (আ) বলেন, “এই লোকগুলো পৃথিবীতে ব্যভিচার করত, তারা হালাল সংসর্গ (স্বামী/স্ত্রী) বাদ দিয়ে হারাম বেছে নিত।”
অন্য একটি হাদিস অনুসারে, নবিজি (সা) এমন বড় বড় পেটওয়ালা লোকদের দেখেছিলেন যারা উঠে দাঁড়াতে পারছিল না। কিছু প্রাণী এসে তাদেরকে পদদলিত করছিল। তাদের সম্পর্কে জিব্রাইল (আ) বলেন, এরা সেইসব লোক যারা রিবার থেকে অর্থ উপার্জন করত। নবিজি (সা) আরও বলেছেন, তিনি এমন লোকদের দেখেছেন যারা আগুনে রাখা তামার কাঁচি দিয়ে তাদের নিজেদের ঠোঁট ও জিহ্বা কাটছিল। এদের সম্পর্কে জিব্রাইল (আ) বলেন, এই লোকেরা অন্যদের ভালো কাজ করতে বলত, কিন্তু নিজেরাই তা করতে ভুলে যেত।
নবিজি (সা) আরও বলেছেন, তিনি দাজ্জালকে দেখেছেন, যার একটি চোখ ছিল ফোলা। আরেকটি হাদিস অনুসারে, নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি দাজ্জালকে দেখেছি । আমি তোমাদের এমন কিছু বলব যা অন্য কোনো নবি তাঁদের উম্মতকে বলেননি। দাজ্জালের বাম চোখটি ছিল পচা আঙুরের মতো (অর্থাৎ তার একটি চোখ অস্বাভাবিক রকম ফুলে ছিল)।” তিনি আরও বলেছেন, “জেনে রেখো, দাজ্জাল এক চক্ষুবিশিষ্ট।”

মক্কায় প্রত্যাবর্তন :
নবি করিম (সা) জেরুসালেমে ফিরে আবারও বোরাকে চড়ে বসলেন। এ হচ্ছে সেই একই বোরাক যার ওপর সওয়ার হয়ে তিনি মক্কা থেকে জেরুসালেমে গিয়েছিলেন। তিনি মিরাজে যাওয়ার আগে বোরাকটিকে সেখানে বেঁধে রেখেছিলেন। কয়েকটি বর্ণনা অনুসারে (যা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়), মক্কায় ফেরার পথে নবিজি (সা) কুরাইশদের তিনটি কাফেলা পার হয়ে এসেছিলেন, তিনি সেগুলো চিনতে পেরেছিলেন। একটি কাফেলায় তিনি পরিচিত এক কুরাইশকে দেখতে পান। দ্বিতীয় কাফেলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তৃষ্ণার্ত বোধ করলে সেখানকার জলাধার (যা ছিল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত) থেকে পানি পান করেন। তৃতীয় কাফেলাটিতে তিনি এক ব্যক্তিকে দেখতে পান যিনি তাঁর হারিয়ে যাওয়া উটের সন্ধান করছিলেন।
মক্কায় ফিরে এসে নবিজি (সা) প্রথমে একটু ঘুমিয়ে নেন, তারপর হারামে জেগে ওঠেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইসরা মক্কা থেকে বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত গিয়ে আবার সেখান থেকে মক্কায় ফিরে এসে সমাপ্ত হয়, যা কোরানের বর্ণনার সঙ্গেও মিলে যায়: “পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে তাঁর নিদর্শন দেখাবার জন্য রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদ আল-হারাম থেকে মসজিদ আল-আকসায়, যেখানকার পরিবেশকে আমি করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্য । তিনি তো সব শোনেন, সব দেখেন।” [১৭:১] নবিজি (সা) ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর নিজের জবানিতেই সাহাবিদের কাছে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “পরের দিন সকালে যখন আমি ঘুম থেকে উঠলাম, তখন আমি লোকদেরকে কীভাবে ঘটনাটি (কী হয়েছিল তা) বলব, তা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ অনুভব করলাম।
এ থেকে আমরা নবিজির (সা) স্বাভাবিক মানবিক সত্তার পরিচয় পাই। অনুমান করা যায়, আল্লাহ তায়ালা ঘটনাটি সবাইকে বলার জন্য মণিজিকে (সা) নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তাঁর পক্ষ থেকে সবাইকে তা বলার কথা নয়। তিনি আরও বলেছেন, “আমি যখন কিছুটা উদ্বিগ্ন বসে ছিলাম, তখন ‘আল্লাহর শত্রু’ আবু জেহেল সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে সে অবস্থায় দেখতে পেল।”
আবু জেহেল নবিজিকে (সা) ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞেস করল: তোমার কী হয়েছে? কিছু ঘটেছে কী? নবিজি (সা): হ্যাঁ, একটা ঘটনা ঘটেছে।
আবু জেহেল: সেটা কী?
নবিজি (সা): গত রাতে আমাকে এখান থেকে জেরুসালেমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আবু জেহেল বিস্মিত হয়ে): তুমি কি এই জগতে আছ (অর্থাৎ তুমি কি ঠিকঠাক আছ)? [নবিজি (সা) এ ব্যাপারে পরবর্তীকালে সাহাবিদের কাছে বর্ণনা করেছেন, “আবু জেহেল ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারছিল না, সে আমার সঙ্গে সেই মুহূর্তেই ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু করবে, না কি লোকজন ডেকে এনে সবার সামনে তা করবে, যাতে আমি যা বলেছি তা থেকে সরে আসতে না পারি।”
নবিজি (সা): হ্যাঁ, আমি এখানে আপনাদের সবার মধ্যেই জেগে আছি। আবু জেহেল: আমি যদি এখন তোমার সম্প্রদায়ের (কুরাইশ) লোকদেরকে ডেকে আনি তবে কি তুমি আমাকে যা বলেছ তা ঠিকঠিক করে তাদেরকে বলবে? নবিজি (সা)। হ্যাঁ, আমি তা করব।
নবিজির (সা) মুখে এ কথা শোনার পর আবু জেহেল চিৎকার করে বলতে লাগল, “সবাই বেরিয়ে এসো। আমার একটা ঘোষণা আছে।” সেই সময় মক্কা ছিল একটি ছোট শহর। শহরের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব আৰু জেহেলের ডাকে সব লোক সেখানে কৌতূহল নিয়ে জড়ো হলো। আবু জেহেল নবিজিকে (সা) উদ্দেশ করে বলল, “তুমি আমাকে যা বলেছ, এখন তা সবাইকে বলো।”
তখন নবিজি (সা) উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন, “গত রাতে আমি বায়তুল মাকদিসে গিয়েছিলাম এবং মসজিদুল আকসায় নামাজ পড়েছি।” লক্ষ করুন, এখানে কিন্তু মিরাজের উল্লেখ নেই। সম্ভবত আল্লাহ তায়ালা তখন তাঁকে শুধু ইসরার কথা উল্লেখ করতে বলেছিলেন। তিনি মিরাজের ঘটনা। পরে শুধু মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করার জন্য রেখে দেন। নবিজির (সা) কথায় উপস্থিত জনতা নানাভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। কেউ হাততালি দিতে থাকে, কেউ মাথায় হাত রাখে, কেউ চাপা হাসি হাসতে থাকে। তারা কী করবে তা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছিল না। (সা) যেহেতু আগে কখনও মিথ্যা বলেছেন বলে কারও জানা ছিল না, তাই লোকেরা বিষয়টা শুনে শুরুতে হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
তাদের মধ্যে একজন, যে আগে একবার জেরুসালেমে গিয়েছিল, জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি এর (বায়তুল মাকদিসের) বর্ণনা দিতে পারবে?” কারণ তারা প্রত্যেকেই জানত, নবিজি (সা) আগে কখনো বায়তুল মাকদিসের ধারে-কাছেও যাননি। এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বায়তুল মাকদিসের বর্ণনা দিতে শুরু করলেন। কিন্তু লোকজন তাঁকে একের পর এক প্রশ্ন করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেল যে তিনি স্পষ্টভাবে আর কিছু স্মরণ করতে পারছিলেন না। হাদিসের বর্ণনা অনুসারে, তিনি উপর্যুপরি প্রশ্নের বেড়াজালে বিভ্রান্ত হয়ে কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েন। হাদিসে ব্যবহৃত শব্দটি ‘কুরবা’; এর আক্ষরিক অর্থ আতান্ত হওয়া। প্রশ্নগুলো যুক্তিসিদ্ধ হলেও তিনি আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কারণে সবকিছু মনে করতে পারছিলেন না। আসলে কোনো মানুষের পক্ষেই সবকিছু স্মরণে রাখা সম্ভব নয়।
নবিজি (সা) আরও বর্ণনা করেছেন, “আমি লোকদের প্রশ্নের কী জবাব দেব তা নিয়ে ভাবছিলাম। একপর্যায়ে আমি দেখতে পেলাম, বায়তুল মাকদিস দূর থেকে আমার দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হচ্ছে। আস্তে আস্তে তা বড় হতে হতে আকিল ইবনে আবি তালিবের বাড়ির ওপরে চলে এল। প্রিসঙ্গক্রমে, এটি ছিল আৰু তালিবের বাড়ি, যেখানে নবিজি (সা) বড় হয়েছিলেন। তারপর তারা যত প্রশ্ন করেছে, আমি সবগুলোইর যথাযথ উত্তর দিতে পেরেছি, কারণ আমি তখন দিব্যদৃষ্টিতে আমার সামনে বায়তুল মাকদিস দেখতে পাচ্ছিলাম।” অবশেষে তাদের মধ্যে একজন বলল, “মুহাম্মদ (সা) বায়তুল মাকদিসের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ নির্ভুল।” ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুসারে, এ সময় নবিজি (সা) তাদের বলেন, “আমি আপনাদের কিছু লক্ষণ (প্রমাণ) দেব।”
তিনি তিনটি কাফেলার বর্ণনা দেন এইভাবেঃ
- প্রথম কাফেলাটি অমুক অমুকের, তারা শীঘ্রই ফিরে আসবে।
- দ্বিতীয় কাফেলাটি অমুক অমুকের, তারা একটি উট হারিয়ে ফেলেছে।
- তৃতীয় কাফেলাটি অমুক অমুকের, তাদের একটি বড় পানির কলস ছিল, যা থেকে তিনি (নবিজি) পান করেছিলেন।
এ কথা শুনে আবু জেহেল বলল, “যদি তুমি একটি কাফেলাকে এরকম জায়গায় দেখে থাক, তবে সেটার তো ইতিমধ্যে মক্কায় পৌঁছে যাওয়া উচিত।” এসব কথাবার্তা চলতে চলতেই খবর পাওয়া গেল, প্রথম কাফেলাটি মক্কায় প্রবেশ করছে। আবু জেহেল সরেজমিনে গিয়ে দেখল, নবিজির (সা) বর্ণনা পুরোপুরি সঠিক। তখন সে ফিরে এসে বলল, “এটা পরিষ্কার একটা জাদু।” ইবনে হিশামে বর্ণিত আছে, “মুসলিমদের মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে কেউ কেউ এই ঘটনা মেনে নিতে পারেনি; তাই তারা ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে।” তবে এই বর্ণনার সঙ্গে কোনো ইসনাদ নেই। এটা শুধু ইবনে হিশামেই আছে, অন্য কোনো সিরাহ গ্রন্থে নেই।
ইবনে হিশামের এই বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে যায় । শুরুতেই বলতে হবে, মক্কার যুগে কোনো মুসলিমেরই মুরতাদ হওয়ার (ধর্ম ত্যাগ করার) কোনো ঘটনা আমাদের জানা নেই। সহিহ বুখারির একটি হাদিস অনুসারে, হিজরতের সপ্তম বছরে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে (যিনি তখন মুসলিম ছিলেন না) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তাদের (মুহাম্মদের অনুসারীদের) মধ্যে কেউ কি ধর্ম গ্রহণের পরে ধর্মত্যাগ করেছে?” আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেছিলেন, “না।” সুতরাং এটাই বাস্তব যে মক্কার সময়ে কেউ ইসলাম ত্যাগ করেনি। অতএব এটা নিশ্চিত যে ইবনে হিশামের এই বর্ণনা সঠিক নয়।

আল-সিদ্দিক:
মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন, একটি অথেনটিক বর্ণনা অনুসারে জানা যায়, নবিজির (সা) মুখ থেকে ইসরার ঘটনা সরাসরি শোনার আগেই আবু বকরের (রা) কাছে সেই খবর পৌঁছে যায়। একজন কুরাইশ ছুটে গিয়ে আবু বকরকে (রা) বলে, “আপনি কি জানেন আপনার সঙ্গী এইমাত্র কী বলেছে? সে দাবি করেছে সে নাকি জেরুসালেমে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে; দুই মাসের পথ এক রাতের মধ্যেই!”
জবাবে আবু বকর (রা) বলেন, “তিনি যদি তা বলে থাকেন তবে তা অবশ্যই সত্য।” এ থেকে আবু বকরের (রা) নবিজির (সা) প্রতি শুধু অগাধ আস্থাই নয়, তাঁর বুদ্ধিমত্তারও পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি (আবু বকরের) কিন্তু বলেননি, ‘হ্যাঁ, তিনি গিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি তিনি বলে থাকেন তাহলে এটা সত্য। কারণ, কুরাইশ ব্যক্তিটি তো মিথ্যাও বলতে পারে।
আবু বকরের (রা) কথাটি শুনে কুরাইশ লোকটি বলে, “আপনি কি তাঁর এমন দাবি বিশ্বাস করেন?” আবু বকর (রা) জবাবে বলেন, “সাত আকাশের উপর থেকে তাঁর কাছে ওহি আসার যে দাবি তিনি করেছেন, তা তো এর চেয়েও আশ্চর্যজনক দাবি; আমি তো তাতেও বিশ্বাস করি।” নবিজির (সা) ওপর অকৃত্রিম বিশ্বাস রেখে এভাবে অকপটে সত্য মেনে নেওয়ার কারণে আবু বকরকে (রা) এর পর থেকে ‘আল সিদ্দিক’ (সত্যবাদী) বলা হয়।

পবিত্র কোরানে ইসরা ও মিরাজ বিষয়ক প্রশ্নোত্তোর:
আমরা ইতিমধ্যে আলোচনা করেছি, আল্লাহ তায়ালা সুরা ইসরার ইসরার ঘটনা এবং সুরা নাজমে মিরাজের ঘটনার ওপর আয়াত নাজিল করেছেন। ইসরা বিষয়ে সুরা ইসরার শুরুতে মাত্র একটি আয়াতই আছে; সুরাটির বেশিরভাগ অংশেই ইহুদিদের অবাধ্যতা, বায়তুল মাকদিসের পবিত্রতা এবং শেষ সময়ে কী ঘটবে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সুরা নাজমে মিরাজের বিষয়ে বেশ কয়েকটি আয়াত আছে:
প্রশ্ন ১। নবিজি (সা) কি মিরাজে আল্লাহকে দেখেছেন?
ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন, নবি করিম (সা) মিরাজে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে দেখেছিলেন। কিন্তু সহিহ বুখারিতে আছে, আয়েশা (রা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি বলে যে নবিজি (সা) আল্লাহকে দেখেছেন তিনি সম্পর্কে এক বিশাল মিথ্যাচার করছেন, কারণ আল্লাহ কোরানে বলেছেন, ‘তাঁকে তো দৃষ্টিতে পাওয়া যায় না, বরং দৃষ্টিশক্তি তাঁরই অধিকারে।” [সুরা আনআম, ৬:১০৩]
সহিহ মুসলিমে আছে, সাহাবিদের অন্যতম ছাত্র মাশরুক একবার আয়েশাকে (রা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমাকে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করার অনুমতি দিন, এ নিয়ে আমার ওপর রাগ করবেন না। আল্লাহ কি বলেননি, ‘সে তো তাঁকে স্বচ্ছ দিগন্তে দেখেছে’ [৮১:২৩), এবং নিশ্চয়ই সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল। [৫৩:১৩], ‘তাঁদের দুজনের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল’ [৫৩:৯]? [প্রাসঙ্গিক বিষয়: একজন সাহাবি নবিপত্নী আয়েশাকে (রা) কীভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন তা নিয়ে কারও মনে প্রশ্ন আসতে পারে।
উল্লেখ্য যে, নিকাব ও হিজাবের আড়াল ছাড়া আয়েশা (রা) কখনোই প্রকাশ্যে উপস্থিত হননি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে নবিজির (সা) স্ত্রীদের সম্পর্কে বলেছেন, “তোমরা তাঁর স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।’ [৩৩:৫৩] এই ক্ষেত্রেও মাশরুক জিজ্ঞেস করার সময় আয়েশা (রা) পর্দার অন্তরালে ছিলেন, যাতে তাঁর শারীরিক অবয়ব না বোঝা যায়। এমনকি তিনি যখন বাইরে বের হতেন, তখন তাঁর উটের চারদিকে একটা অতিরিক্ত আবরণ থাকত।]
মাশরুকের প্রশ্নের জবাবে আয়েশা (রা) প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে: “তোমার কথা শুনে আমার চুল দাঁড়িয়ে গেছে। আমিই সর্বপ্রথম নবিজিকে (সা) এই তিনটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। এই কথাগুলো জিব্রাইলের (আ) বিষয়ে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালার বিষয়ে নয়।” তিনি আরও বলেন, “তুমি কি কোরানে পড়নি, ‘তাঁকে তো দৃষ্টিতে পাওয়া যায় না, বরং দৃষ্টিশক্তি তাঁরই অধিকারে’ [১০৩]? তুমি কি কোরানে আরও পড়নি, ‘মানুষের এমন মর্যাদা নাই যে, আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলবেন ওহির মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার অন্তরাল ছাড়া, এমন দূত পাঠানো ছাড়া, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করেন।’
[42:5117 এখানে দেখা যাচ্ছে, বিষয়টি সম্পর্কে আয়েশার (রা) বেশ পরিষ্কার ধারণা ছিল। মাশরুক ভেবেছিলেন, তিনি আয়েশাকে (রা) কাবু করে ফেলবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উল্টোটাই হয়েছিল। সহিহ মুসলিমে আরও আছে, আবু জর আল-গিফারি (রা) একবার নবিজিকে (সা) সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রসুল! আপনি কি আপনার প্রতিপালককে দেখেছেন?” জবাবে নবিজি (সা) বলেছিলেন, “সেখানে আলো ছিল; আমি কীভাবে তাঁকে দেখতে পাব?” পণ্ডিতদের মতে, এখানে আল্লাহ তায়ালার হিজাবের আলো সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, নবিজি (সা) এমন এক স্থানে গিয়েছিলেন যেখানে তিনি ছাড়া আর কেউই ছিলেন না; এবং তিনি সেখানে আল্লাহর পর্দা বা আবরণ দেখতে পেয়েছিলেন।
সহিহ মুসলিমের অন্য একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তায়ালার নূরের (জ্যোতির, আলোর) হিজাব রয়েছে। যদি তিনি তা উত্তোলন করতেন, তবে তাঁর মুখমণ্ডল থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মিতে সবকিছু (সৃষ্টির প্রতিটি জিনিস) ধ্বংস হয়ে যেত।” সুতরাং ‘আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর নূর। [২৪:৩৫] তাঁর হেদায়েতও নূর। আমরা আল্লাহ তায়ালার প্রত্যেক নাম ও গুণের সত্যতা সমর্থন করি, তবে এর পেছনের কারণ অনুধাবন করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আল্লাহর নূর এতটাই শক্তিশালী যে তা সমগ্র সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। মুসা (আ) আল্লাহ তায়ালাকে দেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে আল্লাহ তাঁর পর্দা এক মুহূর্তের জন্য উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো পাহাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। [৭:১৪3]
এই পৃথিবীতে কোনো সৃষ্টিই আল্লাহর সৌন্দর্যের সামনে টিকতে পারে না। সৃষ্টিকে তাঁর বিশালতা থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহ তায়ালা নিজের জন্য পর্দা/আবরণ রেখেছেন। পৃথিবীতে আমরা যেসব পর্দা দেখি, এই পর্দা সে সবের মতো নয়। আল্লাহর পর্দা নূরের পর্দা। তাহলে সৃষ্টিকুল কীভাবে পরের দুনিয়ায় আল্লাহকে দেখতে পাবে? আসলে পরের দুনিয়ায় আমাদের শারীরিক অবস্থা হবে ভিন্নতর, এই দুনিয়ার মতো নয়। তা হবে এক সত্যিকারের পুনরুত্থান। তখন আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে দেখতে সক্ষম হব। এই দুনিয়ায় কেউ আল্লাহকে দেখেনি, দেখতে পাবেও না। সুতরাং ইবনে আব্বাসের বক্তব্য এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়: হয় তিনি ভুল করেছেন, নয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে নবিজি (সা) আল্লাহকে মন দিয়ে দেখেছেন (দিবা দৃষ্টিতে নয়)।
প্রশ্ন ২: ইসরা ও মিরাজ কি স্বপ্ন ছিল?
ইসরা ও মিরাজ কি স্বপ্ন ছিল? নাকি ছিল শারীরিকভাবে ভ্রমণ? তাবেয়িন ও তাবেয়ি-তাবেয়িনদের বিভিন্ন বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে প্রথম যুগের পণ্ডিতদের কেউ কেউ বলেছেন, তা ছিল স্বপ্ন। নবিজি (সা) বলেছেন, ‘আমি মক্কায় কাবার সামনে জেগে উঠেছিলাম।’ এই কথা থেকে তাঁরা অনুমান করে নিয়েছিলেন যে, যেহেতু তিনি জেগে উঠেছিলেন, তাহলে তা নিশ্চয়ই স্বপ্ন ছিল। তবে এই বর্ণনা এসেছে হাতেগোনা কয়েকজনের কাছ থেকে। স্পষ্টতই তাঁরা একটিমাত্র বাক্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা করেছেন।
মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক ইসলামের পণ্ডিত-গবেষকেরা সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন যে, ইসরা ও মিরাজ শারীরিকভাবেই (দেহ ও প্রাণ সহযোগে) ঘটেছিল। নবিজি (সা) যে তখন স্বপ্ন দেখছিলেন না, বরং জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন, তার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। তিনি যদি স্বপ্নই দেখে থাকেন, তাহলে তো এতে অলৌকিক কিছু নেই। কেউ যদি চাঁদে যাওয়ার কিংবা অতীতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাহলে তার মধ্যে অলৌকিক কিছু নেই।
ঘটনাটি যদি স্বপ্নই হয়ে থাকে, তবে নবিজি (সা) পরের দিন তা কুরাইশদের জানানোর সময় কেন এতটা নার্ভাস ও আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন? অধিকন্তু, তাঁকে জেরুসালেমে নিয়ে যাওয়ার জন্য বোরাকের মতো একটি প্রাণীর প্রয়োজন ছিল। নবিজি (সা) ফিরে আসার পথে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ায় তাঁকে পানি পান করতে হয়েছিল, এটা তাঁর জাগ্রত অবস্থা প্রমাণ করে।
আমাদের সময়ে প্রগতিশীল ও আধুনিকতাবাদী অনেকেই এসব অলৌকিক ঘটনা (যেমন: লোহিত সাগরের বিভাজন, চাঁদের বিভাজন, ইসরা ও মিরাজ ইত্যাদি) বিশ্বাস করতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। তাঁরা অনেক সময় এগুলোকে ‘বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, যা নিতান্তই ভুল। এগুলো ছিল মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা। নিঃসন্দেহে ইসরা ও মিরাজ শারীরিকভাবেই ঘটেছিল।

ইসরা ও মিরাজ থেকে জ্ঞাতব্য:
ইসরা ও মিরাজের ঘটনা পবিত্র কোরানে এবং ৪০টিরও বেশি ‘মুতাওয়াতির” হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এটা অস্বীকার করা কোরান ও সহিহ হাদিস অস্বীকার করারই শামিল। কোনো মুসলিম তা করতে পারেন না।
১) প্রাথমিকভাবে ইসরা ও মিরাজের উদ্দেশ্য দুটি: প্রথমত, নবি করিমকে (সা) তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত করা; দ্বিতীয়ত, তিনি যে দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করছিলেন সে বিষয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া। সিনাই পাহাড়ে আল্লাহর সঙ্গে মুসার (আ) সাক্ষাতের ঘটনা ছিল ইসরা ও মিরাজের একটি ছোটখাটো উদাহরণ। সেখানে আল্লাহ মুসার (আ) সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাঁকে কিছু মিরাকল দান করার বিষয়টি জানিয়েছিলেন (যেমন: তাঁর লাঠি ফেলে দিলে তা সাপ হয়ে যাবে, তাঁর পকেটে হাত রেখে আবার বের করলে তা সাদা হয়ে যাবে, ইত্যাদি)।
কেন তাকে মিরাকল দান করা হয়েছিল? আসলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসাকে (আ) তা দিয়েছিলেন তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে। দেখা যাচ্ছে, এমনকি নবিদেরও ইমান জোরদার করার প্রয়োজন হতে পারে। ইব্রাহিমও (আ) বলেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখান আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন। নিশ্চয়ই আমি তা (আপনি যা করতে পারেন) বিশ্বাস করি, তবে এ শুধু আমার মনকে বুঝ দেওয়ার জন্য।”
[সুরা বাকারা, ২:২৬০] নবি করিমকে (সা) আল্লাহ কী মিরাকল দেখিয়েছিলেন যা তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারে? নবিজির (সা) জন্য মিরাকলটি ছিল ইসরা ও মিরাজ, যেখানে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দেখিয়েছিলেন তিনি যা প্রচার করছেন তা কোনো কল্পনার বিষয় নয়। জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, নবি ইত্যাদি সবকিছুই সত্য। নবিজি (সা) ছাড়া অন্য কেউ এসব দেখেনি।
২) একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, পুরো ইসরা ও মিরাজের ঘটনাটি ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রসুলের (সা) জন্য একটি বিশেষ ব্যক্তিগত উপহার। সাধারণভাবে, নবিদের মিরাকল দেওয়া হয় অবিশ্বাসীদের কাছে তাঁদের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য। তবে কখনও কখনও আল্লাহ তায়ালা শুধু নবিদের জন্যই, অর্থাৎ তাঁদের সন্তুষ্ট করার জন্যই কিছু মিরাকল দেন। ইসরা ও মিরাজ তেমনি একটি উপহার।
৩) এই উপহার এমন এক সময়ে দেওয়া হয়েছিল যখন নবিজি (সা) অত্যন্ত দুঃখকষ্টের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছিলেন। সেই সময় তিনি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী ও স্নেহশীল চাচাকে হারিয়েছিলেন; এবং তায়েফের লোকেরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে পাথর ছুড়ে মেরেছিল। সুতরাং বলা যায়, সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবেই তাঁর কাছে উপহারটি এসেছিল। এ থেকেই আমরা এর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে পারি। এ থেকে আমরা আরও দেখতে পাই, প্রতিটি কষ্টের পরেই স্বস্তি রয়েছে। (৯৪:৫] যত বেশি কষ্ট, তত বেশি স্বস্তি: যদি আমরা ধৈর্যশীল হই ও অবিচল থাকি।
৪) ইবনে কাসির বলেছেন, নবি করিম (সা) ইসরা ও মিরাজে যা দেখেছিলেন তার একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি মানুষের মধ্যে কেউ দেখতে পেত, তাহলে সে পাগল হয়ে যেত। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, নবিজি (সা) সব দেখে ফিরে এসে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়েও নিয়েছিলেন। এ থেকে আমরা তাঁর ইমান, সাহস ও দৃঢ় মনোবলের পরিচয় পাই, যা স্বয়ং আল্লাহ কোরানে উল্লেখ করেছেন, (11) “তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি বা দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি।” [৫৩:১৭] এখানে আল্লাহ নবিজির (সা) সাহসের প্রশংসা করছেন।
একটি হাদিসে আছে, নবিজি (সা) আছে, বলেছেন, “আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে তোমরা এতটা হাসতে পারতে না; বরং অনেক কান্নাকাটি করতে।” অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেছেন, “আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের রেখে মাঠে ময়দানে কিংবা মরুভূমিতে বেরিয়ে পড়তে (অর্থাৎ পাগল হয়ে যেতে)।
৫) এই ঘটনা থেকে নবি করিমের (সা) মানবিক রূপের (আনন্দ, দুঃখ, ভয়, উত্থান-পতন ইত্যাদি) বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই। ফিরে আসার পর তিনি অত্যন্ত নার্ভাস ছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে লোকেরা এই ঘটনা অস্বীকার করবে, তাঁকে নিয়ে উপহাস করবে। তবু তিনি আবু জেহেলকে সত্য ঘটনা নির্দ্বিধায় বলে নিয়েছিলেন, যা তাঁর সাহসের পরিচয় বহন করে।
৬) কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমাদের কখনোই ইসলামের বাণী পরিবর্তন বা তাতে প্রীতিকর রং লাগানো উচিত নয়। আমাদের কাজ হলো ‘প্রোডাক্ট’ বিক্রি করা (এক্ষেত্রে ইসলামের বাণী প্রচার করা)। আমরা এখানে ‘বিক্রয়কর্মী’), আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তন করার কোনো অধিকার আমাদের নেই। আল্লাহ কোরানে বলেছেন, “তোমার কর্তব্য তো কেবল প্রচার করা, আর হিসাবনিকাশ তো আমার কাজ।” [সুরা রাদ, ১৩:৪০ ) এই আয়াতটি রসুলের (সা) উদ্দেশে নাজিল হয়েছে। সন্দেহ নেই, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসুলকে (সা) যা করতে বলেছেন, তিনি তা সঠিকভাবেই পালন করেছেন।
৭) ইসলামের সত্যতা প্রদর্শনের জন্য প্রমাণ উপস্থাপন করার অনুমতি রয়েছে। যখন কুরাইশরা নবিজিকে (সা) জেরুসালেম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন তিনি কিন্তু তাদের বলেননি “আমাকে বিশ্বাস করো।” বরং বায়তুল মাকদিসের অবয়ব তাঁর যতটা মনে ছিল, ততটারই বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন, যাতে কুরাইশরা তাঁর বর্ণনার সঙ্গে বায়তুল মাকদিসের প্রকৃত অবয়বের মিল- অমিল যাচাই করে তাঁর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে নিতে পারে।
৮) এখানে আমরা ইব্রাহিমের (আ) দুই পুত্রের (হজরত ইসমাইল (আ) ও হজরত ইসহাক (আ)) মধ্যে একটি চমৎকার যোগসূত্র দেখতে পাই। ইসরা ও মিরাজ মক্কায় শুরু হয়ে জেরুসালেম পর্যন্ত গিয়ে, তারপর আবার জেরুসালেম হয়ে মক্কায় এসে শেষ হয়। এই দুইয়ের মধ্যে যোগসূত্রটি খুবই স্পষ্ট। তবে এখানে মক্কাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে যেহেতু যাত্রার শুরু এবং শেষ সেখানেই।
এখান থেকে আমরা মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল আকসা এই দুটি মসজিদের গুরুত্ব সম্পর্কেও জানতে পারি। শেষ সময়ে এই বায়তুল মাকদিসেই ইসা (আ) ও দাজ্জালের মধ্যে চূড়ান্ত লড়াই সংঘটিত হবে। খেয়াল করুন, খ্রিষ্টানরা সুলায়মানের (আ) টেম্পলের পবিত্রতা পদদলিত করে সেটাকে ভগ্নস্তূপে পরিণত করেছিল। উমর (রা) জেরুসালেম বিজয়ের পর সেখানকার জঞ্জাল পরিষ্কার করে ঠিক সেই একই জায়গাতেই মসজিদটি নির্মাণ করেন, কারণ তিনি বায়তুল মাকদিসের মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। কিছু পণ্ডিতের ব্যাখ্যা অনুসারে, এই ঘটনার মধ্যে কেবলা বায়তুল মাকদিস থেকে কাবার দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ইসরা ও মিরাজের ঘটনার দুই বছরের মধ্যেই কেবলা পরিবর্তন হয়েছিল।
৯) বোরাকের অস্তিত্ব, মিরাজ যাত্রা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে আমরা দেখতে পাই, আমাদের চেনা পৃথিবীর বাইরে আরও পৃথিবী রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের সৃষ্টির বাইরে আরও সৃষ্টি রয়েছে। আমাদের কখনোই ভাবলে চলবে না। যে, মানুষই আল্লাহ তায়ালার একমাত্র সৃষ্টি। আল্লাহ পবিত্র কোরানে বলেছেন, “আর তিনি সৃষ্টি করেন এমন অনেক কিছু যা তোমরা অবগত নও।” [সুরা নাহল, ১৬:৮]
১০) বোরাকের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের কার্য-কারণ সম্পর্ক বোঝাচ্ছেন। কোনো কিছুই এমনিতে হয় না, চেষ্টা থাকতে হয়। অন্য কথায়, শুধু ‘আল্লাহ ভরসা’ বলে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। বরং লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সর্বদা চেষ্টা করতে হবে। এমনকি আল্লাহ আপনাকে আশীর্বাদস্বরূপ কোনো মিরাকল দিলেও তা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, নবিজিকে (সা) বায়তুল মাকদিসে পৌঁছানোর জন্য বোরাকে আরোহণ করতে হয়েছিল, এবং সেখানে পৌঁছার পর বোরাকটিকে সেখানে বেঁধে রাখতে হয়েছিল।
পবিত্র কোরানে আছে: যখন মরিয়মকে (আ) আশীর্বাদ হিসেবে আকাশ থেকে ফল পাঠানো হয়েছিল, তখন ফলটি ছিল একটি গাছে এবং ফলটি পাড়ার জন্য গাছটিকে ঝাঁকাতে হয়েছিল। [১৯:২৫] যেখানে মিরাকলের জন্যও চেষ্টা করতে হয় (অন্য কথায়, একটা উপলক্ষ্যের প্রয়োজন হয়), সেখানে দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে চেষ্টার প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ এমনিতেই কিছু দিয়ে দেন না। কিছু পাওয়ার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের অর্থ চাই? আমরা রোগ থেকে আরোগ্য পেতে চাই? আমরা যা চাই, আল্লাহ তা পাওয়ার পথ তৈরি করে রেখেছেন। তবে তা পেতে আমাদের অবশ্যই কিছু করতে হবে। এমনকি লোহিত সাগরকে বিভক্ত করার জন্য মুসাকে (আ) আল্লাহ বলেছিলেন, “তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো।” [২৬:৬৩) অর্থাৎ ঘটনাটি আপনাআপনি ঘটেনি, মুসার (আ) লাঠির আঘাতের প্রয়োজন হয়েছে। অতএব আমরা যে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই, তার জন্য আল্লাহ কাজ ও কারণ ঠিক করে দিয়েছেন।
১১) দুধ ও মদের কাহিনির মধ্য দিয়ে আমরা নবি করিমের (সা) মনের পবিত্রতার পরিচয় পাই। এই ঘটনার সময় মদ হারাম ছিল না। তবু তিনি মন্দের বিপরীতে ভালোকে বেছে নিয়েছিলেন, কলুষতার ওপরে শুদ্ধতাকে স্থান দিয়েছিলেন। জিব্রাইল (আ) বলেছেন, “আপনি ভালোকে বেছে নিয়েছেন। আপনি যদি মদ বেছে নিতেন, তবে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হতো।” আমরা ইতিমধ্যে মদের চেয়ে দুধের অনেক বেশি উপকারিতার কথা আলোচনা করেছি। এখানে একটি প্রতীকী বিষয় হলো, নবিজির (সা) সামনে দুটি পথ ছিল: ইসলাম (সঠিক পথ) বনাম অন্য (ভ্রান্ত) পথ। তিনি ভ্রান্ত পথের ওপরে স্থান দিয়েছিলেন ইসলামকে, অর্থাৎ সঠিক পথকে।
(১২) ইসরা ও মিরাজে নবিজি (সা) ইমানের বেশিরভাগ স্তম্ভ বাস্তবিকভাবেই দেখতে পেয়েছিলেন: (ক) তিনি আল্লাহর পর্দা দেখেছেন এবং আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। (খ) তিনি জিব্রাইলকে (আ) আসল রূপে দেখেছেন, অন্য অসংখ্য ফেরেশতাদেরও দেখতে পেয়েছেন। (গ) তিনি প্রধান সব নবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন; (ঘ) তিনি তাঁদের সঙ্গে কেয়ামতের দিন ও এর লক্ষণ সম্পর্কে আলাপ করেছেন। (ঙ) তিনি জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেছেন; (৫) এমনকি তিনি আদমের (আ) ডান ও বাম দিকে লোকদের দেখে এবং সপ্তম আকাশের ওপরে কলমের লেখার শব্দ শুনে কদরের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন।
১৩) এখানে আমরা সব নবির মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের পরিচয় দেখতে পাই। নবিজিকে (সা) নামাজের নেতৃত্বের জন্য মনোনীত করার বিষয়ে আল্লাহর আদেশ সব নবিই মেনে নিয়েছিলেন। এমনকি মুসা (আ) নিজের উম্মতের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করলেও মহানবি মুহাম্মদের (সা) প্রতি কোনো বিরূপ মনোভাব, ক্রোধ কিংবা হিংসা প্রকাশ করেননি।
১৪) আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে মহানবি মুহাম্মদকে (সা) সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। তিনি আদম সন্তানদের ‘সাইয়িদ’ বা নেতা, তিনি নবিদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পার হয়ে আরও এগিয়ে গিয়েছেন, আল্লাহর পর্দা দেখেছেন এবং কলমের লেখার শব্দ শুনেছেন। অন্য কোনো ব্যক্তির পক্ষে এরকম মর্যাদার স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
১৫) ইসরা ও মিরাজের মধ্য দিয়ে আমরা নামাজের গুরুত্ব ও মর্যাদার পরিচয় পাই। ইসলামে অন্য কোনো বিধান এরকম বিশেষ পদ্ধতিতে নাজিল করা হয়নি। সন্দেহ নেই, নামাজই আমাদের ধর্মের মূল।
১৬) মুসার (আ) উম্মাহর ওপর আমাদের উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্ব। প্রতিদিন পাঁচবার নামাজের বিষয়ে মুসা (আ) বলেছেন, “আমার উম্মাহ তা করতে পারত না।” তবে আল্লাহ জানতেন যে, আমরা তা পারব এবং নবিজি (সা) তা গ্রহণ করেছিলেন। সব যুগেই আমাদের উম্মাহর একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ে।
ইসরা ও মিরাজের ধর্মতাত্ত্বিক আতব্য ও গুরুত্ব
১) আল্লাহ যে আমাদের ওপরে অবস্থান করছেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্ম নবি করিমের (সা) উর্ধ্বলোকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়। কিছু মানুষ বিশ্বাস করে, ‘আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান’। এই ধারণা যে ভুল তা মিরাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
২) জান্নাত ও জাহান্নাম আছে এবং আমাদের বর্তমান সময়েও বিরাজ করছে।
৩) দুধ যেমন বিশুদ্ধতার প্রতীক, মানুষের ফিতরাও তেমনি স্বাভাবিকভাবেই বিশুদ্ধ। ইসলাম ধর্ম একই রকম বিশুদ্ধ যা আমাদের সত্তার সঙ্গে খাপ খায়, এটি আমাদের কলুষিত করে না।
ইসরা ও মিরাজের ফিকহ-বিষয়ক জ্ঞাতব্য ও গুরুত্ব
১) কারও দরজা দিয়ে প্রবেশের আগে অনুমতি চাইতে হবে। জিব্রাইল (আ) প্রতিটি আকাশে প্রবেশের সময় অনুমতি চেয়েছিলেন। দরজায় কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে পরিচয় জানতে চাইলে শুধু ‘এটা আমি’ বললে হবে না, আমাদের নাম বলতে হবে, যেমনটি জিব্রাইল (আ) বলেছিলেন, “আমি জিব্রাইল।” এ সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিসও আছে, যেখানে একজন সাহাবি নিজের নাম উল্লেখ না করে ‘এটা আমি’ বললে নবিজি (সা) বিরক্ত হয়েছিলেন।
২) যখন একজন আরেকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কোথাও যান, তখন যিনি যান তিনি সেখানে আগে থেকে অবস্থানকারী ব্যক্তিকে প্রথমে সালাম জানাবেন। আমরা জানি, ইসরা ও মিরাজে অন্য নবিগণ মহানবি মুহাম্মদের (সা) অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু নবিজি (সা) তাঁদেরকে আগে সালাম জানিয়েছিলেন।
৩) কাউকে সুসংবাদ দেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অন্য নবিগণ মুহাম্মদকে (সা) সুসংবাদ দিয়েছিলেন।
৪) অন্যের মঙ্গল হতে পারে এমন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া অনুমোদিত হয়েছে এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। নবি করিম (সা) না চাইলেও মুসা (আ) তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কাউকে সাহায্য করা আমাদের দ্বীনেরই অংশ।
৫) কাবার দিকে পিঠ দিয়ে (অর্থাৎ কাবার উল্টোদিকে মুখ করে) বসে থাকা বৈধ। ইব্রাহিম (আ) বায়তুল মামুরের দিকে পিঠ দিয়ে বসেছিলেন। আমাদের কোনো কোনো সংস্কৃতিতে এমন ধারণা আছে যে, কাবার দিকে পিঠ দিয়ে থাকার অনুমতি নেই। কিন্তু এটা সঠিক নয় বলেই এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়।
৬) আমরা পরোক্ষভাবে (সরাসরি নয়) দেখতে পাই, দিনের বেলা ভ্রমণের চেয়ে রাতের বেলা ভ্রমণ শ্রেয়। এ সম্পর্কে একটি হাদিসও রয়েছে। নবিজি (সা) বলেছেন, “তোমরা যখন ভ্রমণ করো, তা রাতে করো; কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দূরত্ব অতিক্রম করা তখন আরও সহজ করে দেন।” তাই বলে দিনে ভ্রমণে কোনো অসুবিধা নেই, তবে দুটোর মধ্যে বেছে নিতে হলে রাতের ভ্রমণই উত্তম।
